তৃণমূলে যেন শ্রেণিসংগ্রামের ছবি

194

রহিত বসু, ১৪ জুলাই : ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে ভারতের বিদায়ের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন রসিকতা চালু হয়েছে- ভারতীয় ক্রিকেটে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, আগামী বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের ম্যানেজার প্রশান্ত কিশোর। তাঁকে এবং রবি শাস্ত্রীকে একই মানদণ্ডে দেখার কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাটমানি ক্যাশব্যাক প্রকল্প। তৃণমূলের ভিতরে-বাইরে সকলেরই দৃঢ় বিশ্বাস, পিকে-র বুদ্ধিতেই মমতা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তারপর থেকেই তৃণমূলে যেন শ্রেণিসংগ্রামের পরিস্থিতি। দলের নীচুতলার সঙ্গে উপরতলার এমন ফারাক আগে কখনও দেখা যায়নি। এই এক ঘোষণায় যেন দলের ভিতটাই নড়ে গিয়েছে। অবস্থা দেখে অনেকে এখন হালকা সুরে জানতে চাইছেন, পিকে-কে কি অমিত শা পাঠালেন নাকি?

তৃণমূলের অনেক নেতাই এখন বলতে শুরু করেছেন, পিকে যদি এমন বুদ্ধি দিদিকে দিয়ে থাকেন, তাহলে এই রাজনৈতিক দুর্যোগের জমানায় দিদি সেটা গ্রহণ করলেন কোন যুক্তিতে? কারণ, পিকে না জানলেও এই পৃথিবীতে একমাত্র মমতাই জানেন, কাটমানির সাম্রাজ্যে হাত পড়লে দলের অন্দরে তার কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে? এতে মমতার ভাবমূর্তি হয়তো উজ্জ্বল হচ্ছে, কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় বিক্ষোভের জেরে দলের নীচুতলার কর্মীদের গায়ে কালি লেগে গিয়েছে। আর কে না জানে, কর্মীদের গায়ে কালি লাগলে দলের গায়ে কালি লাগে, যতক্ষণ না সেইসব কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রশ্ন হল, এখনও পর্যন্ত যাঁদের বিরুদ্ধে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অথবা যাঁদের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ হচ্ছে কিংবা যাঁরা বিক্ষোভের ভয়ে বাড়িছাড়া তাঁদের কারও বিরুদ্ধে কি তৃণমূল কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? বা তদন্তের কথা ঘোষণা করেছে?

অন্যদিকে, এখন নীচুতলার যেসব নেতার বাড়ির সামনে বিক্ষোভ হচ্ছে, তাঁরা দরজা-জানলা বন্ধ করে উপরতলার নেতাদের উদ্দেশে বোধহয় মন্ত্র জপছেন-তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ…! নীচুতলার অনেক নেতা বলছেন, ৭৫:২৫ বণ্টনের ফর্মুলা তো উপরতলার নেতারাই বলেছিলেন। তাহলে আমাদের ঘাড়েই এখন শুধু দোষ চাপছে কেন? কাটমানি ক্যাশব্যাক প্রকল্প কি আলাদা নিয়মে চলছে নাকি? প্রশ্ন শুধু এখানেই থামছে না। কাটমানির সংজ্ঞা নিয়ে কথা চলছে। যেমন, কাটমানি নিয়ে যাঁরা ভোটের টিকিট পাইয়ে দেন বলে অভিযোগ ওঠে তাঁরাও কি কাটমানি ফেরত দেবেন? যেমন, অনেকে জানতে চাইছেন, বীরভূমে যিনি নকুলদানা বিলি করেন, জলপাইগুড়ির বারোপাটিয়ার বাহুবলী নেতা কিংবা কোচবিহারের থ্রি পার্সেন্ট নেতা কি এই আইনের আওতায় আসবেন? এই সব প্রশ্ন শুনে ভাবছি, স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে মহাপুরুষদের সামলাতে পারেন না, প্রশান্ত কিশোর কী করে সামলাবেন তাঁদের?

এনজেপি স্টেশনের কাছে তৃণমূলের ছাপ্পা গায়ে লাগিয়ে যেসব নেতা এতদিন তোলাবাজি করে এসেছেন তাঁদের তোলাবাজি কি বন্ধ হয়ে গিয়েছে? তোলা তুলতে গিয়ে শিলিগুড়ির যে নেতা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কি কেউ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন? যেমন ধরুন শনিবার সকালে গৌতম দেব যখন বিধান মার্কেটে গেলেন, তখন তাঁর পাশে তৃণমূলের এমন এক নেতাকে দেখা গেল যিনি তোলা হিসেবে টাকাপয়সার পাশাপাশি সবজিও নিয়ে থাকেন। শিলিগুড়ি শহরের প্রায় সকলেই একথা জানেন। গৌতম দেব জানেন না? তিনি কি জানেন না, ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির যে দুই নেতা ভোটের সময় তাঁর পায়ের তলার মাটি কেটেছেন, তাঁরা বছরভর কত টাকা তুলে থাকেন? যদি না জেনে থাকেন তাহলে আর জনসংযোগ যাত্রা করে লাভ নেই।

সাধারণ মানুষ কিন্তু সব বোঝেন, তাঁদের বোকা ভেবে লাভ নেই। মানুষকে বোকা ভাবলে ভোটে পিছিয়ে থাকতে হবে। ভাবমূর্তি উদ্ধারের কোনো চেষ্টাই কাজে লাগবে না।