অহেতুক আতঙ্কে সেফ হাউস আজ বৃদ্ধাশ্রম

83

ভাস্কর বাগচী, শিলিগুড়ি :  ‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার। মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার।’ নচিকেতার হিট গানের খুব চেনা লাইন। করোনা ভাইরাসের দাপট বাড়ার সুবাদে হাসপাতাল, সেফ হাউসগুলিতে ভিড় বাড়ছে। সেফ হাউসে যাঁরা ভর্তি থাকছেন তাঁদের মন ভালো রাখতে সেখানে টিভি, গান শোনার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই গানের তালিকায় এই গান রয়েছে কি না জানা না গেলেও নচিকেতার বহু বিখ্যাত এই বৃদ্ধাশ্রম-এরই প্রতিফলন আজকাল এই সেফ হাউসগুলিতে।

ভাইরাসের দাপটে বয়স্করা সংক্রামিত হচ্ছেন। বাড়ির ছোটরা তাঁদের সেফ হাউসগুলিতে ভর্তি করে দিচ্ছেন। তাঁরা সেরেও উঠছেন। আর আসল খেলাটা এরপরই শুরু হচ্ছে। অভিযোগ, সেরে ওঠা বয়স্কদের তাঁদের বাড়িতে ফেরাতে সেফ হাউস কর্তৃপক্ষগুলির রীতিমতো কালঘাম ছোটার জোগাড় হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ির লোকদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। বেশকিছু ক্ষেত্রে ভর্তির সময় ভুল ঠিকানা দেওয়ার অভিয়োগ উঠেছে। ফোন নম্বর? তাতেও ইচ্ছাকৃত ভুল। অভিযোগ, গোটা নম্বরের বেশ কয়েকটি সংখ্যায় অদলবদল করে দেওয়া হচ্ছে। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বাড়ির লোকেরা ইচ্ছে করে স্বাস্থ্য দপ্তরের ফোন নম্বর ধরছেন না। এই বয়স্কদের নিয়ে তাঁরা এখন কী করবেন সে বিষয়ে স্বাস্থ্য আধিকারিকরা ভেবে কোনও কূলকিনারা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে সংক্রামিতের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে এসব ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কোনওভাবেই সম্ভবপর হচ্ছে না। শিলিগুড়ির একটি সেফ হাউসের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিত্সক ডাঃ এসপি দে বলছেন, এমন কোনও পরিস্থিতিতে আমাদের যে কোনও দিন পড়তে হতে পারে তা আমরা কোনও দিন কল্পনাও করিনি।

- Advertisement -

দেশজুড়ে করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে জনজীবন নাজেহাল। প্রতিদিন রেকর্ড সংখ্যক মানুষ সংক্রামিত হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। পাশাপাশি, আতঙ্কও। কেউ করোনা সংক্রামিত হলে গতবারের মতো এবারও বেশ কয়েক জায়গায় সামাজিক বয়কটের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। করোনার উপসর্গ দেখা গেলেও স্রেফ সামাজিকভাবে বয়কট হতে হবে ধরে নিয়ে অনেকে গোটা বিষয়টি বিলকুল চেপে যাচ্ছেন। এর জেরে তাঁরা নিজেরা যেমন বিপদে পড়ছেন, নিজের পরিবার এমনকি আশপাশের অনেককেও বিপদে ফেলছেন। এই পরিস্থিতিতে সেফ হাউসগুলির আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠার ঘটনা আমাদের সবার উদ্বেগ বাড়িয়ে চলেছে।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে জায়গা নেই। নার্সিংহোমে ঠাঁই নেই। এই পরিস্থিতিতে সেফ হাউসগুলি করোনা সংক্রামিতদের ভরসা জোগালেও হালের এই ঘটনা স্বাস্থ্য দপ্তরকে রীতিমতো চাপে ফেলে দিয়েছে। নার্সিংহোমগুলির ক্ষেত্রে যেহেতু টাকাপয়সার বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে তাই তাদের এই হ্যাপা পোহাতে হচ্ছে না। তবে অভিযোগ, সেফ হাউসগুলির মতো উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই ভোগান্তি ভুগতে হচ্ছে।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ কল্যাণ খান বলছেন, সেফ হাউস বা হাসপাতালে ভর্তি থেকে যাঁরা সুস্থ হয়ে উঠছেন তাঁদের বাড়িতে নিয়ে গেলে পরিবারের অন্যরা সংক্রামিত হতে পারেন। অনেকের মধ্যে এমন ভুল ধারণা রয়েছে। এই ধারণার কোনও ভিত্তিই নেই। গোটা বিষয়ে আমাদের আরও মানবিক হতে হবে।