জঙ্গলে কাঠচোরদের দাপট, গ্রামে হানা বুনোর

289

রাঙ্গালিবাজনা : এ যেন ঠিক টিট ফর ট্যাট! মানুষ বনে ঢুকে গাছ কেটে পাচার করার চেষ্টা করল। অন্যদিকে, হাতি বন থেকে বেরিয়ে গ্রামে তাণ্ডব চালাল। বুধবার রাতে আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট-বীরপাড়া ব্লকের দুটি পৃথক এলাকায় এমন দুটি ঘটনায় ফের বন্যপ্রাণী ও মানুষের সংঘাতের চিত্র সামনে আসে। কাঁচা টাকা কামানোর লোভে কাঠচোরের দল মাদারিহাট-বীরপাড়া ব্লকের বিভিন্ন বনে ঢুকে মূল্যবান গাছ কেটে সাবাড় করছে। আবার বন ফাঁকা হওয়ায় খাবারের খোঁজে হাতির পাল লোকালয়ে লাগাতার হানা দিচ্ছে। হাতির হানায় বাড়িঘর, শস্যখেতের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বুধবার গভীর রাতে কাঠ মাফিয়ারা বীরপাড়া সংলগ্ন দলমোর বনাঞ্চল থেকে গাছ কেটে গাড়িতে চাপিয়ে পাচার করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। দলছুট একটি দাঁতাল একই সময় মাদারিহাট রেঞ্জের উত্তর খয়েরবাড়ির বন থেকে বেরিয়ে ইসলামাবাদের হাজিপাড়া এলাকায় তাণ্ডব চালাচ্ছিল।
রাতে দলমোর বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটলেও বনকর্মীরা অবশ্য গুঁড়িগুলি পাচারের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছেন। নজরদারি চালিয়ে শেষরাতে বীরপাড়া থানার অন্তর্গত পাগলি নদীর কাছে গোপালপুর চা বাগান এলাকায় দুটি গাড়ি সহ লক্ষাধিক টাকার কাঠ বাজেয়াপ্ত করেন বন দপ্তরের জলপাইগুড়ি ডিভিশনের দলগাঁও রেঞ্জের কর্মীরা। দলগাঁওয়ের রেঞ্জার দোরজি শেরপা জানান, দুটি যাত্রীবাহী ছোট গাড়ির প্রত্যেকটিতে সেগুন গাছের তিনটি করে গুঁড়িবোঝাই করা ছিল। গোপালপুর চা বাগানের কাছে পাগলি নদীর তীরে গাড়ি দুটিকে আটকান বনকর্মীরা। গাড়ি সহ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে ৪০ সিএফটি পরিমাণ কাঠ। এগুলির বাজারদর কমবেশি ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা বলে বন দপ্তর সূত্রের খবর। রেঞ্জার বলেন, গাড়ি ফেলেই চম্পট দেয় পাচারকারীরা। তাদের খোঁজ চলছে। একই রাতে  মাদারিহাট থানার হাজিপাড়ার বাসিন্দা বাবর আলির ঘরের বেড়া ভেঙে খাবারের সন্ধান চালায় দাঁতালটি। বাবর জানান, তখন পরিবারের সদস্যরা ঘরেই ছিলেন। হাতিটি প্রথমে পাটশোলার বেড়ার ওপর দিয়ে দাঁত ঢুকিয়ে দেয় ভেতরে। দাঁতের গুঁতোয় ঘরের শোকেস হুড়মুড়িয়ে পড়ে চৌকির ওপর। পরমুহূর্তেই বেড়া ভেঙে ফেলে হাতিটি। বাবর বলেন, অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছি। হাতিটি ঘরের আশপাশে ১৫-২০ মিনিট ধরে ঘোরাঘুরি করছিল। আমরা বেরিয়ে পালাতেও পারছিলাম না। দাঁতালটি এলাকার বাসিন্দা আলতাফ হোসেনের আলুখেতে হানা দিয়ে বেশ কিছুটা জমির আলু সাবাড় করে। এরপর ওই এলাকার আনন ওরাওঁয়ের বাড়িতে হানা দিয়ে ঘরের বারান্দায় রাখা একটি ধানভরতি বস্তা শুঁড়ে পেঁচিয়ে চম্পট দেয়। খবর পেয়ে মাদারিহাট রেঞ্জের উত্তর খয়েরবাড়ি বিটের কর্মীরা ঘটনাস্থলে যান।
খয়েরবাড়ি বনাঞ্চলটি একসময় আন্ধারকোটা ফারাস বা অন্ধকারময় বন নামে পরিচিত ছিল। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, একসময় এতই ঘন ছিল ওই বনটি যে তাতে দিনেরবেলাতেও আলো ঢুকত না। কিন্তু কাঠ মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যে একসময় বনাঞ্চলটি ফাঁকা হয়ে যায়। পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায় হাতির হানা। ইদানীং হাতি ছাড়াও প্রায়ই বনের হরিণ লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। হাজিপাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত বৃদ্ধ আলতাফ হোসেন বলেন, এলাকায় দিনের পর দিন হাতির হানা বেড়েই চলেছে। বন দপ্তরের অবশ্য দাবি, খয়েরবাড়ি বনাঞ্চল থেকে কাঠচুরি একপ্রকার বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফাঁকা জায়গাগুলিতে হাজার হাজার গাছের চারা লাগানো হয়েছে। সেগুলি বেড়ে উঠছে। বৃহস্পতিবার সকালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটি পরিদর্শন করেন উত্তর খয়েরবাড়ির বিট অফিসার বিধান দে। ক্ষতিপূরণের আবেদনের ফর্ম বিলি করেন তিনি। বিট অফিসার বলেন, ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাবেন।