খয়েরবাড়ির সিংহাসনে জুনিয়র বাঁয়া, ঘুম নেই গ্রামবাসীদের

322

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা: রাজা আসে, রাজা যায়! কিন্তু সিংহাসন খালি থাকে না কখনও। আলিপুরদুয়ারের মাদারিহাটের খয়েরবাড়ির জঙ্গলের সিংহাসনে এখন বসেছে ‘জুনিয়র বাঁয়া গণেশ’। সেই যে বছরখানেক আগে ভিন জঙ্গল থেকে এসে খয়েরবাড়িতে ঘাঁটি গাড়ল, আর এলাকা ছাড়ার নাম নেই। মাঝে মাঝে ধূমচীর বনে ঢুঁ মারলেও দু’দিনেই ফিরছে খয়েরবাড়িতে। বলা ভালো, জুনিয়র বাঁয়া গণেশ রীতিমত জাঁকিয়ে বসেছে খয়েরবাড়ির সিংহাসনে।

রাত তো বটেই, মাঝে মাঝে বিকেল হতে না হতেই বন থেকে বেরিয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ইসলামাবাদের দিকে মুখ করে রীতিমতো হুঙ্কার ছাড়ে। আর তখনই বাজি, পটকা, টিন নিয়ে প্রস্তুত হতে হয় গ্রামবাসীদের। রাত হলেই শুরু হয় অপারেশন। তার ভয়ে বন লাগোয়া গ্রামগুলির বাসিন্দাদের ঘুম একপ্রকার উবেই গিয়েছে। আর বাঁয়ার বিরুদ্ধে ফসল নষ্ট, বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগ শুনতে শুনতে তিতিবিরক্ত বনকর্মীরাও।

- Advertisement -

দাঁতালদের মধ্যে কতগুলি এমন হাতি রয়েছে যাদের একটিমাত্র দাঁত রয়েছে। এরা বাঁয়া গণেশ নামে পরিচিত এলাকায়। কারণ, হাতিকে বন লাগোয়া গ্রামগুলির বাসিন্দাদের অনেকেই হাতি না বলে গণেশ নামে অভিহিত করেন। এর  আগেও  খয়েরবাড়ির বনে এসেছিল অন্য বাঁয়া গণেশরা। কিছুদিন থেকে চলেও গিয়েছে অন্যত্র। একসময় মাদারিহাটের খয়েরবাড়ি বনাঞ্চলে ৭-৮ দিনের বেশি থাকত না কোনো দলছুট হাতি বা কোনও হাতির পাল। এক বন থেকে এসে খয়েরবাড়িতে হপ্তাখানেক থেকে বেরিয়ে যেত অন্য বনের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু ইদানিং হাতিদের সেই প্রবৃত্তিতে পরিবর্তন এসেছে। দিনের পর দিন সেখানে থাকছে হাতির পাল। কখনও ঘাঁটি গাড়ছে  দলছুট একদাঁতওয়ালা ‘বাঁয়া গণেশ’, কখনও লেজকাটা, কখনও আবার একচোখা। বছর তিনেক আগে এক বাঁয়া গণেশ বন লাগোয়া গ্রামগুলির বাসিন্দাদের কাছে ত্রাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ওই বাঁয়া মারা যায় সঙ্গীনি দখলের লড়াইয়ে। এরপর আসে আরেক বাঁয়া। ওই বাঁয়াও পরে চলে যায় অন্যত্র। এখন তার ‘সিংহাসনে’ বসেছে জুনিয়র তৃতীয় বাঁয়া। বনদপ্তরের এখন মাথাব্যাথার কারণ হয় দাঁড়িয়েছে সে!

খয়েরবাড়ি বনাঞ্চল চারিদিকে রয়েছে মাদারিহাট বীরপাড়া ও ফালাকাটা ব্লকের বিভিন্ন লোকালয়‌। এলাকায় সারা বছরই লেগে থাকে হাতির হানা। মাদারিহাটের ইসলামাবাদ গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, অত্যন্ত জেদি এবং একরোখা ওই দলছুট দাঁতালটি। একবার বন থেকে বেরিয়ে গ্রামে হানা দিলে পেট না ভরা পর্যন্ত সেটিকে কিছুতেই বনে ফেরানো যায় না। ওই এলাকারই বাসিন্দা মহম্মদ মন্তাজুল বলেন, আমরা সারাদিন পরিশ্রম করি জীবিকা নির্বাহের জন্য। কিন্তু রাতে হাতির আতঙ্কে ঘুমোতে পারি না। আর বাঁয়া গণেশ যখন থেকে ঘাঁটি গেড়েছে, তখন থেকে সমস্যা আরও বেড়েছে।

ফালাকাটার পশ্চিম শালকুমারের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, আমাদের এলাকা তটস্থ হয়ে রয়েছে বাঁয়া গণেশের ভয়ে। মাঝে মাঝেই হানা দিয়ে এলাকায় তাণ্ডব চালাচ্ছে বাঁয়া গণেশ। বনকর্মীদের বক্তব্য, লাগাতার গাছের চারা রোপণের ফলে খয়েরবাড়ির বন এখন ঘন হয়েছে। তাই হাতির পাল এখানে থাকার উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছে। এছাড়া এক বন থেকে আরেক বনে যাওয়ার করিডোরগুলিতে বাড়িঘর তৈরি হওয়ায় হাতির চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। জলদাপাড়ার সহকারী বন্যপ্রাণ সংরক্ষক দেবদর্শন রায় বলেন, করিডোরগুলি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেক সময় একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে থাকছে হাতি।