নাগরাকাটা : বড়ো জোর আট ফুট বাই দশ ফুটের দরমার বেড়ার ঘর। তার এক কোণেই তক্তপোশের ওপর সাড়ে চার বছরের কন্যা সংগীতাকে নিয়ে তখন ঘুমে কাদা বাবা ছবিলাল রায় ও মা লক্ষ্মী রায়। ডায়নার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা একটি হাতি প্রথমে ওই বাড়িটির রান্নাঘর গুঁড়িয়ে দিয়ে ভেঙে ফেলে শোয়ার ঘরও। পরিস্থিতি এমনই গোটা ঘর তখন হাতির দখলে। বেরিয়ে আসার ফাঁকা জায়গাও নেই। বিষয়টি টের পেতেই রায়দম্পতি হাতির পেটের তলা দিয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পার হয়ে উঠোনে গেলেও বের করে আনতে পারেননি একমাত্র মেয়েকে। এরপরই ঘটল সেই মিরাকল। দাঁতালটি শুঁড়ে করে ওই শিশুকে তক্তপোশ থেকে উঠিয়ে পরম মমতায় রেখে দিয়ে গেল বাড়ির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মা-বাবার পাশে। গল্পের মতো এমন ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টা নাগাদ নাগরাকাটার খেরকাটা গ্রামে। প্রখ্যাত হস্তীবিশেষজ্ঞ পার্বতী বড়ুয়া বলেছেন, হাতি অত্যন্ত শিশুবত্সল। পারতপক্ষে বাচ্চাদের ওপর কোনো আক্রমণ করে না। বেশ কয়েবছর আগেও ডুয়ার্সে অনেকটা এরকমই একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেবার গাছের তলায় রেখে জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে যাওয়া এক দম্পতির সন্তানকে হাতি শুঁড়ে করে বয়ে এনে লাগোয়া গ্রামের ভেতর রেখে দিয়ে চলে যায়। উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট পরিবেশবিদ অনিমেষ বসুর কথায়, হাতি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সংবেদনশীল প্রাণী। বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে এমনকি ধাওয়া করেও মানুষকে মেরেছে এমন ঘটনা হামেশাই ঘটছে। তবে এর প্রেক্ষিত আলাদা। আবার এদিন খেরকাটায় যা ঘটল তার পেছনেও য়ে অন্য কারণ আছে তা বলাই বাহুল্য। হাতিদের কাছ থেকে এসবই আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়। য়দিও তা নিয়ে ভাবার সময় মানুষের নেই।

নাগরাকাটার আংরাভাসা-১ গ্রাম পঞ্চায়েছের খেরকাটা গ্রাম হাতি উপদ্রুত। মঙ্গলবার ভোরে ওই গ্রামটির দক্ষিণ অংশে দুটি হাতি একসঙ্গে ঢোকে। বন দপ্তর ও স্থানীয় সূত্রের খবর, তার মধ্যে একটি দাঁতাল হামলা চালায় পেশায় দিনমজুর ছবিলালের বাড়িতে। রান্নাঘর দুরমুশ করে দিয়ে হাতিটি যখন শোয়ার ঘরও ভাঙছে সেসময়ই টের পেয়ে খাটে উঠে বসেন ওই দম্পতি। ছবিলালের স্ত্রী লক্ষ্মী বলেন, আলোও ফুটতে শুরু করেছে সেসময়। চোখ মেলেই দেখি ঠাকুরের (হাতি) শরীরে গোটা ঘর ঢাকা পড়েছে। ওই অবস্থাতেই ওর পেটের তলা দিয়ে আমরা বেরিয়ে আসি। মেয়েকে বের করতে গিয়ে ওর বাবা আর পারেনি। এরপর যা দেখলাম তা এখনও বিশ্বাসই করতে পারছি না।

হাতিটি শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরায় সংগীতার সামান্য আঘাত লেগেছে। পাশাপাশি, ঘটনার পর থেকে সে আতঙ্কেও রয়েছে। সকাল হতেই তাকে নিয়ে বনকর্মীরা সুলকাপাড়া গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন। তবে, পরে দু-একবার বমি হওয়াতে তাকে ফের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার ডাক্তার সুপর্ণ হালদার বলেন, এমন ঘটনা এর আগে দেখিনি। শিশুটি সচেতনই আছে। তবুও এক্সরে সহ আরও কয়েটি পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য মালবাজার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে রেফার করা হয়। বন দপ্তরের খুনিয়া স্কোয়াডের রেঞ্জার রাজকুমার লায়েক বলেন, সংগীতা এখন মালবাজারের হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা ভয়ের কিছু নেই বলে জানিয়েছেন। খেরকাটার দশাই ওরাওঁ, উদয় রায়, অজয় ওরাওঁ, মেঘলাল রায়ে মতো প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, হাতির সঙ্গেই বাস। তবে ওরা যে এরকমও হয় জানা ছিল না।