ডেটাবেসে ফুটবলের ভবিষ্যৎ দেখছে ইপিএলের ক্লাবগুলি

লন্ডন : আইএসএল আর এসসি ইস্টবেঙ্গলের দৌলতে রবি ফাওলার নামটা আর বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে অপরিচিত নয়। কিন্তু জোসেফ ওয়ামস্লি কিংবা জ্যাক ইনম্যান? নাম শুনে ভ্রূ কোঁচকাতে বাধ্য হবেন ময়দানের পোড়খাওয়া মানুষও। এই দুজনেই ফাওলারের কোচিং টিমের সদস্য। প্রথমজন পারফরমেন্স অ্যানালিস্ট, দ্বিতীয়জন স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট।

ফুটবল মাঠে বিজ্ঞানীর কাজ কী? প্রশ্ন তুলতেই পারে বাংলার ময়দান। তবে বিশ্ব ফুটবলের আঙিনায় তাদের আনাগোনা নতুন ঘটনা নয়। সেটা ইপিএলে চোখ রাখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়।

- Advertisement -

স্কাউটিংয়ে যুগ অস্তমিত, সময় এখন ডেটা অ্যানালিস্টদের। ডেটা প্রযুক্তির এই অনিবার্যতাকে অনেক আগেই স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন সেভিয়ার স্পোর্টিং ডিরেক্টর মোনাচি। দুবছর আগে বলেছিলেন, বিশাল ডেটাবেস ফুটবলের ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে আমাদের স্ক্রাউটের থেকেও বেশি নির্ভর করতে হবে গণিতজ্ঞ, ইঞ্জিনিয়ার, সংখ্যাতত্ত্ববিদের বুদ্ধিমত্তার ওপর।

মোনাচির কথা আজ ফলিত জ্যোতিষ। সাফল্যের খোঁজে তার পিছনেই দৌড়োচ্ছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের প্রথমসারির সব ক্লাব। কে নেই সেই ময়দানে! ম্যাঞ্চেস্টার সিটি থেকে গতবারের ইপিএল চ্যাম্পিয়ন লিভারপুল। এমনকি দীর্ঘদিন বড় কোনও সাফল্যের স্বাদ না পাওয়া আর্সেনাল। আছে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডও। তবে দৌড়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে রেড ডেভিলসরা। প্রত্যেকের হাতিয়ার একটাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা। তাতেই জমজমাট ইপিএলের ক্লাবগুলির সাইবার যুদ্ধ।

এই লড়াইয়ে বেশ কয়েককদম এগিয়ে ম্যাঞ্চেস্টার সিটি। অর্থব্যয়ে যথেষ্ট সুনাম রয়েছে সিটি গ্রুপের কর্তাদের। তবে অপাত্রে দান নয়, বেশ আটঘাট বেঁধেই যে পরিকল্পনা সাজিয়েছেন তাঁরা। মরশুমের শুরুতে সিটি গ্রুপ নিযুক্ত করছে একঝাঁক রকেট সায়েন্টিস্টকে। উদ্দেশ্য একটাই সাফল্য ও পারফরমেন্সের নিরিখে নিজেদের ফুটবল টিমকে বাকিদের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়া। নিজস্ব ডেটা টিম তৈরিতে ইতিমধ্যে গুগলের সহায়তা নিয়ে বৌদ্ধিক প্রতিযোগিতার আযোজনও করেছেন ম্যান সিটি কর্তৃপক্ষ।

এই ডেটা টিমের সদস্য অর্থাৎ বুদ্ধিজীবী এজেন্টের কাজ, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে দলের ফুটবলারদের পারফরমেন্সের যাবতীয় তথ্য একত্রিত করা। পাশাপাশি বিভিন্ন ম্যাচের ভিন্ন পরিস্থিতির সাপেক্ষে ফুটবলারদের সক্ষমতাকে কোচিং ম্যানেজমেন্টের সামনে তুলে ধরা। তাদের দেখানো পথে যে সাফল্য অনিবার্য, তা চলতি মরশুমে পেপ গুয়ার্দিওলার ম্যান সিটির অপ্রতিরোধ্য ফুটবলেই প্রমাণিত।

এর গুরুত্ব যে কতটা, সেটা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলেন জুর্গেন ক্লপ। তখন অবশ্য তিনি লিভারপুলের কোচ নন, বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের দাযিত্বে। ২০১৪-১৫ মরশুমে ক্লপের কোচিংয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ডর্টমুন্ড। এমনকি বুন্দেশলিগায় অবনমনের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। ক্লপ-ম্যাজিক শেষ, এমন দাবিও উঠতে শুরু করেছিল। সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন জার্মান কোচ। লিভারপুলের দায়িত্বে এসে জোর দিয়েছেন ডেটা বিশ্লেষণ প্রযুক্তিতে। তাঁর পরামর্শে আনা হয়েছে ডঃ ইয়ান গ্রাহামকে। যিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ। শুধু তাই নয়, রেড জায়ান্টরা ডেটা টিমে নিয়ে এসেছেন ডেফিড স্টিলের মতো চ্যাম্পিয়ন দাবাড়ু, টিম ওয়াসকেটের মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে। তাঁদের নোটবুকে জায়গা হচ্ছে বিভিন্ন দলের বল পজিশন, ফুটবলারদের সুযোগ তৈরির দক্ষতা।

সর্বোপরি ফুটবলার বাছাইয়ে মিসাইল-টেকনোলজির সাহায্যও নিচ্ছে ক্লপের লিভারপুল। ডেটা টিমের মুখ গ্রাহাম বলেছেন, আমরা একটা সপ্তাহের ২০০-র ওপরে ম্যাচ ধরে বিশ্লেষণ করি। নজর দিই ফুটবলারদের পাসিং, থ্রো, শট ও গোলের দক্ষতার দিকে। সেই ডেটা বেসকে গুরুত্ব না দেওয়ার খেসারত দিতে হয়েছিল ডর্টমুন্ডকে। হার্ভার্ডের পদার্থবিদ গ্রাহামের কথায়, বুন্দেশলিগায় দশ মরশুমের পারফরমেন্সের বিচারে ডর্টমুন্ড দুর্ভাগ্যতম তালিকায় দ্বিতীয়। যার খেসারত দিতে হয়েছে ক্লপকেও।

ক্লপ সেই দুর্ভাগ্যের গ্রাস থেকে বেরোতে পারলেও পারেনি আর্সেনাল। সাফল্যের খোঁজে থাকা ইপিএলের অন্যতম সফল ক্লাবটিও এবার তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া। এক্ষেত্রে মিকেল আর্তেতাদের হাতিয়ার মিসাইল টেকনোলজি। নিজস্ব ডেটা বেসকে ব্যবহার করেই ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী দল গড়তে তৎপর গানার্সরা। সেই পরিকল্পনায় শামিল আর্সেনালের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চেলসিও। কিউলিকভিউয়ের মতো সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে ফুটবলারদের ডেটা বেস তৈরি করছে ব্লুজরা।

সাইবার-যুদ্ধে অবশ্য একেবারে আনকোরা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড। সাম্প্রতিক অতীতে বড় নামের পিছনে ছুটে সেই তারকা ফুটবলারদের ম্যান ইউ জার্সি পরাতে ব্যর্থ রেড ডেভিলস কর্তারা। তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সদ্য আটজনের ডেটা স্পেশালিস্ট নিযুক্ত করেছে রেড ডেভিলস। লক্ষ্য, নামের বদলে কাজের ফুটবলার দলে নেওয়া। সফল হলে গোঁড়া ম্যান ইউ ভক্তও বলতে বাধ্য হবেন, ডেটা বেস যুগ যুগ জিও।