মহামারি, সামাজিক বৈষম্য এবং চা শ্রমিক

বিকাশ দাস : করোনা মহামারি আমাদের সামনে অনেক প্রশ্ন নতুন করে তুলে ধরেছে। প্রশ্নগুলি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মানবাধিকার বিষয়ক। করোনা সংক্রমণ রুখতে আমাদের দেশে এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতা চলছে। এই লড়াই ভাইরাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে। কিন্তু দেশের আর্থসামাজিক বৈষম্য এই লড়াইয়ে আমাদের বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মহানগরীগুলিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের শোচনীয় পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই লড়াই আমাদের সমাজের প্রান্তিক স্তরে বসবাসকারীদের পক্ষে কঠিনতর। আমাদের সমাজের একটি বড় অংশের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম অন্ন, বাসস্থান এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা নেই। তবু তাঁরা এই লড়াইয়ে শামিল। এই লড়াই আর শুধুমাত্র একটি ভাইরাসের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই, এই লড়াই এখন সমানভাবে ক্ষুধার বিরুদ্ধেও। কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ আটকাতে সারাদেশকে গৃহবন্দি থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সারাদেশের মানুষকে সোশ্যাল ডিসট্যান্স বজায় রাখা, বাড়িতে কোয়ারান্টিনে থাকার কথা বারবার বলা হচ্ছে। না মানলে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে মোতায়েন করা হচ্ছে রাস্তায়। লকডাউনে সমাজের একটি শ্রেণি যখন ডালগোনা কফি, রকমারি রান্না, শাড়ি পরা ছবি, নিজেদের হবির তালিকা ইত্যাদি নিয়ে ফেসবুক-টিকটকে চ্যালেঞ্জ-চ্যালেঞ্জ খেলতে ব্যস্ত, তখন অন্যদিকে কিছু মানুষ মৃত্যুভয় মাথায় নিয়ে শুধুমাত্র দুমুঠো ভাত জোগাড় করতে কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বলা ভালো, তাঁদের কাজে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা ভারতে ২১ দিনের লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন। পরে ৩ মে এবং তৃতীয়বার ১৭ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। উত্তরবঙ্গের চা বাগানের শ্রমিকরা প্রথম লকডাউনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৩ এপ্রিল থেকে ধীরে ধীরে কাজে যোগ দিয়েছেন। উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিকেও কিন্তু লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছিল। তখন প্রশ্ন ছিল, বাগান বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের মজুরি দেবে কে? মালিক না সরকার বাহাদুর? মালিকপক্ষ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, বাগান বন্ধ থাকলে তারা ভাতা বা মজুরি দিতে অপারগ। কারণ, বিশ্ববাজারে চা রপ্তানিতে মন্দা কয়েক বছর ধরে তো চলছেই! তার ওপর দীর্ঘদিন বাগান বন্ধ থাকা মানে পরিচর্যার অভাবে চায়ের আবাদ নষ্ট হয়ে যাওয়া। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, লকডাউনে কাজ বন্ধ থাকলে দেশের চা শিল্প প্রায় ২০০০ কোটি টাকা লোকসানের সম্মুখীন হতে পারে। এই ক্ষতির জেরে কিছু বাগান চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এমতাবস্থায় মালিকপক্ষ বাগান খোলার অনুমতি চেয়ে সরকারপক্ষের কাছে লাগাতার দরবার করে গিয়েছে। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠনগুলি বাগান বন্ধ রাখার পক্ষে সওয়াল করেছিল। তাদের বক্তব্য, বাগান খোলা থাকলে হাজার হাজার শ্রমিক একে অপরের সংস্পর্শে আসবেন এবং তাতে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা নিশ্চিতভাবে বহুগুণে বেড়ে যাবে।

- Advertisement -

এমনিতেই চা বাগানের হাজার হাজার বাসিন্দা, যাঁরা কাজের খোঁজে দিল্লি, মুম্বই, তিরুবন্তপুরমের মতো উচ্চহারে সংক্রামিত শহরগুলিতে গিয়েছিলেন, তাঁরা ফিরে এলে বাগান এলাকাগুলি স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে। শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি ছিল, লকডাউনের সময় চা বাগানগুলি বন্ধ রেখে শ্রমিকদের মজুরি এবং র‌্যাশন দেওয়া হোক। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার আগেই মালিকপক্ষকে ৫০ শতাংশ শ্রমিক নিয়ে বাগানগুলিতে উৎপাদন শুরু করার অনুমতি দিয়েছিল। রাজ্য সরকার প্রথমে এই প্রস্তাব না মানলেও পরে ২৫ শতাংশ শ্রমিক নিয়ে বাগানে কাজ শুরু করার অনুমতি দিয়েছে। অর্থাৎ একটি বাগানে ২৫ শতাংশ শ্রমিক একবারে কাজ করার সুযোগ পাবেন। মালিকপক্ষের চাপের কাছে ইতিপূর্বেও সরকার বারবার নতিস্বীকার করেছে। সে মজুরি নির্ধারণ হোক কিংবা পুজোর বোনাস হোক বা লকডাউনের সময়কার ভাতাই হোক, নতিস্বীকারের উদাহরণ কম নয়। তাই এতে নতুনত্ব কিছু নেই। বরং এক্ষেত্রে সরকার খুব সুকৌশলে মালিকপক্ষের কোর্টে বল ঠেলে দিয়ে নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলেছে। ঠিক যেভাবে ১৯৫১ সালের প্ল্যান্টেশন লেবার অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে শ্রমিকদের র‌্যাশন, বাড়ি, স্কুল, স্বাস্থ্য পরিষেবা ইত্যাদি সমস্ত কল্যাণমূলক কাজের দায়িত্ব মালিকপক্ষের হাতে ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্র নিজে শুধুমাত্র নজরদারির ভূমিকায় রয়ে গিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ২৫ শতাংশ হাজিরায় শ্রমিকদের কতটা সুবিধা হবে? এই ব্যবস্থায় একজন শ্রমিক কবে এবং কতদিন কাজ পাবেন?

শুনতে আশ্চর্য মনে হলেও এটা সত্যি যে, অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি যথাক্রমে ১৬৭ টাকা এবং ১৭৬ টাকা। যা এই রাজ্যগুলির ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে (এমজিএন রেগা) মজুরির তুলনায় অনেক কম। অথচ এই চা শ্রমিকদের মজুরিই তামিলনাড়ুতে ৩১৩.৮৩ টাকা এবং কেরলে ৩২৩.৬৯ টাকা। চা বাগান নো ওয়ার্ক নো পে নীতিতে চলে। তাই শ্রমিকরা বছরের সাধারণ সময়ে রবিবারের মজুরি পান না। এখন এই ২৫ শতাংশ ব্যবস্থায় একজন শ্রমিক তাঁর সারামাসের মজুরির চার ভাগের এক ভাগ পাবেন। এই টাকা দিয়ে একটি পরিবারের দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগাড় করাও কঠিন। অন্যদিকে, ঢিলেঢালা নজরদারির জন্য অধিকাংশ বাগানের শ্রমিকরা প্ল্যান্টেশন লেবার অ্যাক্ট-এ প্রাপ্য সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশ-বিদেশের বহু স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থাগুলির রিপোর্টে চা শ্রমিকদের এই করুণ অবস্থার ছবি তুলে ধরা হয়েছে। এখন এর ফলে একদিকে বাগানে কাজ করলে করোনা সংক্রমণের ভয় থাকবে, অন্যদিকে লকডাউনের সময়কার মজুরি না পেলে অনাহারে মৃত্যুর দিন গুনতে হবে শ্রমিক পরিবারগুলিকে। ডুয়ার্সের চা বাগানগুলি ২০০৩-২০০৫ সালে একবার ভয়াবহ মৃত্যুমিছিল দেখেছিল। সেবার শত শত চা শ্রমিকের অনাহারে, অপুষ্টিতে এবং চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক বিশেষ তদন্তকারী দল নিযুক্ত করেছিলেন। যে দলের রিপোর্ট চা বাগানগুলির শ্রমিকদের অপুষ্টি, অনাহার, আশ্রয়হীনতা, পানীয় জলের অভাব, চিকিৎসার ঘাটতি ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যার কথা তুলে ধরেছিল।

কিন্তু তারপরেও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। সংবাদপত্রের পাতা ওলটালে এখনও প্রতিদিন কোনও না কোনও চা শ্রমিকের অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর খবর উঠে আসে। এবার উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলির নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিকে ফিরে তাকানো যাক। উত্তরবঙ্গে বড় এবং মাঝারি মিলিয়ে ২৭৬টি চা বাগান আছে। এই চা বাগানগুলিতে ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২,৬২,৪২৬ জন স্থায়ী শ্রমিক এবং ৮০,৮৫৩ জন অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন এবং সবমিলিয়ে ১,৮৬,৫৫৯টি শ্রমিক পরিবারের ১১,২৪,৯০৭ জন মানুষ বাগানের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। এঁদের অধিকাংশ বিভিন্ন আদিবাসী এবং নেপালি জনগোষ্ঠীভুক্ত। প্রায় তিন-চার পুরুষ আগে এঁরা ছোটনাগপুরের মালভমি এবং নেপাল থেকে উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে এসেছিলেন ইংরেজ আমলে। এই ২৭৬টি বাগানের মধ্যে মাত্র ১৬৬টির নিজস্ব হাসপাতাল রয়েছে। এই হাসপাতালগুলির মধ্যে মাত্র ৫৬টি বাগানে একজন করে পূর্ণ সময়ে ডাক্তার রয়েছেন। ১১০টি বাগানের হাসপাতাল আংশিক সময়ে ডাক্তার দিয়ে চলছে, ১১৬টি হাসপাতালে কোনও নার্স নেই। অন্যদিকে, ১০৭টি বাগানের নিজস্ব কোনও হাসপাতাল নেই। ২৭৬টি বাগানের মধ্যে মাত্র ১৬০টিতে সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা রয়েছে। এটা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শ্রম দপ্তরের দেওয়া সরকারি তথ্য। ফলে ১৯৫১ সালের প্ল্যান্টেশন লেবার অ্যাক্টকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চা বাগানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে ধুঁকে ধুঁকে চলছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

চা বাগানের এই নড়বড়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সারাবছর শ্রমিকদের জ্বর-সর্দি ইত্যাদি ছোটখাটো অসুখ সামাল দিতেই হিমসিম খায়। সেখানে যদি করোনা ভাইরাস মহামারির পরিস্থিতি তৈরি করে, তবে অবস্থা কোন দিকে গড়াবে, তা বুঝতে বিরাট দূরদর্শী হওয়ার প্রয়োজন নেই। চা বাগানগুলিতে কাজ করার সময় সোশ্যাল ডিসট্যান্স বজায় রাখা, হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার এবং মাস্ক পরার কথা হলেও সেটা যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠুনকো আশ্বাসবাণী মাত্র, তা বাগানের লেবার লাইনগুলিতে কান পাতলেই শোনা যায়। সমাজবিজ্ঞানীরা যে প্রশ্নে ধর্মসংকটে পড়েছেন, সেটা হল, এই মুহূর্তে ভাইরাসের সংক্রমণ নাকি অর্থনৈতিক মন্দা, কোন প্রশ্নের উত্তর অগ্রাধিকারের সঙ্গে খোঁজা উচিত? ওপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার যে, আমাদের সমাজে নীচুতলার খেটেখাওয়া মানুষ এই ভাইরাসের সংক্রমণে প্রাণ না হারালেও অনাহারে মৃত্যুর সমূহ সম্ভাবনা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের সমাজের আর্থসামাজিক বৈষম্য কিছু মানুষকে বাধ্য করেছে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে এই মহামারির সময়ে ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করতে যেতে। কাজেই আমরা এই লকডাউনের সময় রাস্তায় কিছু মানুষ দেখে ভয়ে কুঁকড়ে উঠে যতই সোশ্যাল ডিসট্যান্সের কথা বলে বলে চিৎকার করি না কেন, এটাও বুঝতে হবে যে, ঘরবন্দি থেকে ডালগোনা কফির ছবি ফেসবুকে দেওয়ার মতো সোশ্যাল প্রিভিলেজ সবার থাকে না। এই কঠিন সময়ে রাষ্ট্রের উচিত, আরও বেশি মানবিক পদক্ষেপ করা যাতে চা শ্রমিক সহ সমাজের প্রান্তিক স্তরে বসবাসকারী সকলের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং স্বাস্থ্যের অধিকার সুনিশ্চিত হয়।

(লেখক আইআইটি গুয়াহাটিতে জনস্বাস্থ্য ও সোশ্যাল মেডিসিন বিষয়ক গবেষক)