গঙ্গা গিলছে বাড়ি, নিজের ঘর ভাঙছে খুদেরা

150

সেনাউল হক, বৈষ্ণবনগর : ছোট্ট ছেলেটার হাতে হাতুড়ি। বুকে পাথর রেখে নিজের ঘরটা নিজেই ভাঙছে। আর কিছু পরেই যে গঙ্গায় বিলীন হয়ে যাবে স্বপ্নের নীড়! ভিটে বাঁচানো যাবে না, জানে ওরা। তবু ঘরের ইটগুলোর যতটা বাঁচানো যায়। সেই চেষ্টাটাই চলছে বৈষ্ণবনগরের বীরনগরে। প্রায় দেড় মাস ধরে একটানা ভাঙনে বৈষ্ণবনগরের মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বসেছে বীরনগর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের বেশ কয়েকটি এলাকা। দিন কয়েকের মধ্যেই চারটি পাড়া গঙ্গাগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে মুকুন্দটোলা, ঘোষপাড়া, মুচিপাড়া ও সরকারটোলা রয়েছে। কয়েক ঘণ্টার ভাঙনে প্রায় ৪০০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। গঙ্গায় ঝুলে রয়েছে একটি বহু প্রাচীন স্কুল ভবনও। চিনাবাজার,দুর্গারামটোলা, ভীমাগ্রাম, লালুটোলা-সব মিলিয়ে প্রায় হাজার খানেক বাড়ি গঙ্গাগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে।

কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? প্রতি বছর ভাঙন হচ্ছে অথচ গঙ্গা ভাঙন রোধের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
রাজ্যের জলপথ ও সেচ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনের বক্তব্য,ফরাক্কা ব্যারেজ থেকে আট কিলোমিটার আপ স্ট্রিম ও ডাউন স্ট্রিমের দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন ফরাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ। আমরা বারবার ফরাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু তাদের হেলদোল নেই। গঙ্গা ভাঙন ইস্যুটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় ইস্যু। এই এলাকায় কত জমি ফরাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণ করেছিল,সেই সব তথ্য জানা যায়নি। রাজ্য সরকার চাইলেও কাজ করতে পারবে না। সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য আমরা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তাছাড়া পুনর্বাসনের বিষয়টি নিয়ে আমরা তাদের  বলেছি।

- Advertisement -

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফরাক্কা ব্যারেজের মালদার সীমানা সংলগ্ন গেটগুলি খুলে দেওয়ার ফলেই বীরনগর এলাকায় ভাঙন হচ্ছে। সুখা মরশুমে কাজ না করে ভাঙন রোধের জন্য শুধু বালির বস্তা ফেলা হচ্ছে। এর জন্যই কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে। রাজ্য সরকার হোক বা কেন্দ্রীয় সরকার, দুই সরকারই যদি মনে করে, তবে এক বছরের মধ্যেই ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু কেউই ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে না। তাই বছরের পর বছর ভাঙন হয়ে চলেছে। আর আমলা, আধিকারিক ও ঠিকাদাররা মিলে ফায়দা লুটছেন। আর এদিকে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মাসের পর মাস ত্রিপল খাটিয়ে কোনওরকমে বেঁচে আছে অসহায় মানুষগুলো। সেদিকে না কেন্দ্রীয় সরকারের না রাজ্য সরকারের কারও খেয়াল নেই।

প্রথম দিন থেকেই ভীমাগ্রাম, চিনাবাজার, লালুটোলার দুর্গতরা পুনর্বাসন চাইছেন। ২০১৬ সালে গঙ্গা ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া বেশ কিছু পরিবারের অভিযোগ, অনেক আন্দোলনের পর প্রশাসনিকভাবে ৮২টি পরিবারকে পাট্টা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ও প্রায়ই ৬২টি পরিবারকে পাট্টা দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। ভিটেমাটি হারিয়ে শীতলা মণ্ডল, শংকর মণ্ডল, জয়ন্তী মণ্ডলরা পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বীরনগর গার্লস হাইস্কুলের ভবনে।

শীতলা মণ্ডলের অভিযোগ, ২০১৬ সালে প্রথম দফার ভাঙনে যাঁদের বাড়িঘর গঙ্গায় তলিয়ে গিয়েছিল, সেই সব পরিবারের মধ্যে থেকে ৮২ জন পাট্টা পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালে তিন দফায় ভাঙন হয়েছিল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় ভাঙনের ফলে যে সব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, আজও তাদের পাট্টা দেওয়া হয়নি। ওই বছর থেকেই আমরা বীরনগর গার্লস হাইস্কুলে আশ্রয় নিয়ে আছি।

ভাঙন দুর্গত জয়ন্তী মণ্ডল বলেন,পাট্টা পাওয়ার জন্য আমাদের নামও বিডিও অফিসে পাঠানো হয়েছিল। আজ কাল করে করে আমরা শুধু ঘুরেই গিয়েছি। আজ পর্যন্ত পাট্টা পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে যে জমিতে ফরাক্কার ছাই ফেলে ভরাট করা হয়েছিল, সেই জমিতেই নতুন করে ঘর তৈরি করেছিলাম। গত রবিবারের ভাঙনে অতি কষ্টে বানানো সেই নতুন ঘরবাড়িগুলোও গঙ্গা আবার গিলে ফেলেছে। নতুন বাড়ি বানিয়ে ভেবেছিলাম, এখানেই হয়তো জীবনটা কেটে যাবে। কিন্তু দ্বিতীয়বার ফের কপাল ভাঙলো। এখন কি করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।

ভাঙন দুর্গত শংকর মণ্ডল বলেন,আমরা ২০১৬ থেকেই গার্লস হাইস্কুল ভবনে ছিলাম। কিন্তু এই ভবনটিও গঙ্গাগর্ভে তলিয়ে যেতে বসেছে। ভবনের শৌচালয়টি অর্ধেকের বেশি ভেঙে চলে গিয়েছে গঙ্গায়। তাই বাধ্য হয়ে এই ভবনটিও ছেড়ে খোলা আকাশের নীচে বাস করতে হবে।

বীরনগর-১ পঞ্চায়েতের প্রধান সীমা হালদার রায় বলেন,প্রায় দেড়-দুমাস ধরে একইরকমভাবে ভাঙন চলছে। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে গঙ্গায় তলিয়ে যাচ্ছে। এর আগে ভীমাগ্রাম, লালুটোলা, চিনাবাজার এলাকায় ব্যাপক ভাঙনের ফলে প্রায় পাঁচশোরও বেশি বাড়িঘর নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। আমাদের কাছে গ্রামবাসীরা পুনর্বাসন চাইছেন। দুর্গতদের নাম, ঠিকানা নথিভুক্ত করে বিডিও অফিসে জমা দিয়েছি। যদিও এখনও কিছু জানা যায়নি। আবার সরকারটোলা, মুকুন্দটোলা এলাকায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। এখনও পর্যন্ত কাউকেই পুনর্বাসনের জন্য পাট্টা দেওয়া হয়নি। তবে ভাঙন দুর্গতদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা  করেছি। ডিএম কিটও দেওয়া হয়েছে।