ভাস্কর বাগচী, শিলিগুড়ি, ২৯ এপ্রিল : রাস্তায় এদের কাউকে দেখলে কিছু বোঝাই যাবে না। কেউ কলেজের ছাত্রী, কেউ বা গৃহবধূ। কেউ সংসার টানতে অন্ধকার পথে পা বাড়িয়েছেন, আবার কারও কাছে এটা আর পাঁচটা কাজের মতোই একটা পার্টটাইম প্রফেশন। এসকর্ট সার্ভিসের মাধ্যমে এদের যে কাউকে কয়েক ঘণ্টার জন্য সঙ্গী করা যায়। শিলিগুড়ি শহর ও সংলগ্ন এলাকার বেশকিছু অল্পবয়সি মেয়ে এখন ফ্লাইং সেক্স ওয়ার্কার হিসাবে কাজ করছে। আর এদের জন্য মাথায় হাত পড়েছে পতিতাপল্লির যৌনকর্মীদের।

একসময় শহরের যৌনপল্লি দিনেরবেলাতেও গমগম করত। সেখানে এখন রাতেও হাতে গোনা কিছু মানুষ আসে সঙ্গীর খোঁজে। যৌনকর্মীদের অনেকেই স্বীকার করে নিচ্ছেন, কাস্টমারের আশায় দিনভর রোদে রাস্তায় দাঁড়িযে থাকলেও অনেকদিনই কেউ আসে না। অথচ এখানে অনেকেই দৈনিক চুক্তির ভিত্তিতে তথাকথিত মাসিদের অধীনে কাজ করেন। দিনের শেষে ওই মাসিদের টাকা মিটিয়ে দিতে হয়। কিন্তু যেদিন কাস্টমারের দেখা মেলে না সেদিন টাকা দিতে না পারলে মাসি বা দালালদের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হয়। শুধু তাই নয়, একসময় শিলিগুড়ির পতিতাপল্লিতে যারা ফুর্তি করতে আসত, তারা দরদাম করত না। কিন্তু এখন সেখানে দরদাম করে তবে সঙ্গিনী বাছে কাস্টমাররা। কাস্টমার হারানোর ভয়ে দরদাম করলেও প্রতিবাদ করে না এখানকার যৌনকর্মীরা। বরং যে টাকা পায় তাই মুখ বুজে মেনে নেয় তারা।

অন্যদিকে, ফ্লাইং সেক্স ওয়ার্কারদের দাপট এখন শহরজুড়ে। শহরের বুকে মধুচক্রের আসরে হানা দিয়ে পুলিশকর্তারা দেখেছেন, মোটা টাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে দিনরাত বহু জায়গায় চলে এই মধুচক্র। সেখানে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা থেকে শুরু করে অনেক কলেজ ছাত্রীও আসেন। তাদের কেউ কেউ শহরে পেয়িং গেস্ট হিসাবে থাকেন। কেউ আবার শহরেরই বাসিন্দা। কিছু অতিরিক্ত রোজগারের জন্য এই চক্রে জড়িয়েছেন। সম্প্রতি ইসকন রোড এলাকায় বেশ কিছু মধুচক্রের আসর থেকে এরকম কয়েকজন মহিলাকে আটকও করেছিল পুলিশ।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দিনেরবেলা কোনো শপিংমল বা নার্সিংহোমে কাজ করে রাতে এসকর্ট সার্ভিসে কাজ করছেন অনেকে। অনেকে আবার শহরে আসেন শুধুমাত্র বড়ো হোটেলে সেক্স ওয়ার্কারের কাজ করতেই। এদের অধিকাংশই আসেন কোনো অভাবি পরিবার থেকে, আবার অনেকে আসেন শুধুমাত্র অতিরিক্ত অর্থের আশায়। সারাদিন শিলিগুড়ি শহরের বড়ো কোনো হোটেলে কাটিয়ে মোটা টাকা কামিয়ে অনেকে রাতে বাড়ি ফিরে যায়। অনেকে আবার সন্ধ্যার পরেই শহরে আসেন। সারা রাত শহরে কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই তারা শহর ছাড়ে। এক রাতে এদের অনেকে কয়েক হাজার টাকা আয় করে।

পোশাক এবং সাজসজ্জায় এই মহিলারা যথেষ্ট রুচিশীল। কেউ কেউ যথেষ্ট শিক্ষিতও। বছরকয়েক আগে শহরের হাকিমপাড়া থেকে এমন কয়েকজন মহিলাকে স্থানীয় মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আটক করেছিল, যারা প্রত্যেকেই শহরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের। সেদিন পুলিশের হাতেপায়ে ধরেও নিস্তার পাননি তাঁরা। এমনই কয়েকজন জানিয়েছেন, তাঁদের ক্লায়েন্টরাও যথেষ্ট শিক্ষিত ও রুচিশীল। তার উপর এসকর্ট সার্ভিসে দালাল বা মাসিদের উৎপাত থাকে না। যেদিন ইচ্ছা কাজ থেকে ছুটি নেওয়া যায়। ফলে সংসার থাকলেও অসুবিধা হয় না। সবমিলিয়ে আয়ও যেমন বেশি হয়, মার্জিত ক্লায়েন্টও তেমনই পাওয়া যায়।

সম্প্রতি প্রধাননগর এলাকায় উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের ডিপো সংলগ্ন নির্জন রাস্তায় রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কমবয়সিদের আনাগোনা শুরু হয়। সেই খবর প্রকাশিত হতেই পুলিশের নজরদারি বাড়ে। কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছিল। জানা গিয়েছিল, কাস্টমারদের থেকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে ওই এলাকারই নির্জন জায়গাগুলিতে দেহব্যবসা চালাত ওই যুবতিরা। পতিতাপল্লির যৌনকর্মীরা ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছেন এই অসম প্রতিযোগিতায়। তাদেরই একজন বলেন, এভাবে কতদিন চালাতে পারব জানি না। কাস্টমার আগে যত আসতেন এখন তার সিকিভাগও আসে না পতিতাপল্লিতে। এমনও দিন যায়, সারাদিনে একজন কাস্টমারেরও দেখা মেলে না।

যেসব মহিলা একটা সময় স্বেচ্ছায় পতিতাপল্লিতে আসত, তারা এখন আর এখানে না এসে হোটেলে বা ফ্ল্যাটে মধুচক্রে কাজ করে। সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ বলছেন, এতে সমাজের মারাত্মক অবক্ষয় হচ্ছে। পতিতাপল্লির রোশনাই কমলেও শহরের সামাজিক জীবনে অন্ধকার নেমে আসছে।