মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া: এ ক্লাবের প্রতিটি ইটে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের নানা ঘটনাক্রম। এ ক্লাব থেকেই একসময় ভেসে আসত ইংরেজি গানের সুর। স্কার্ট আর হাই হিল পরে সাহেবদের সঙ্গে পার্টিতে নাচতেন মেমসাহেবরা। দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘদিন পরও এ ক্লাবে চালু ছিল পশ্চিমি কালচার। তবে, অনাদরে, অবহেলায় এখন পোড়োবাড়ির চেহারা নিয়েছে বীরপাড়ার ইউরোপীয়ান ক্লাব। অনেকেরই অভিযোগ, পরিত্যক্ত ক্লাব চত্বর এখন জুয়া সহ নানা অসামাজিক কাজকর্মের আখড়া। দাবি উঠেছে, বীরপাড়ার ইউরোপীয়ান ক্লাবটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হোক। রাঙ্গালিবাজনার বাসিন্দা তথা দার্জিলিঙের সাউথফিল্ড কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক ডঃ দীনেশ রায় বলেন,  পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এলাকার ইতিহাসের নিদর্শন তুলে ধরতেই ইউরোপীয়ান ক্লাবটি সংরক্ষণের জন্য পদক্ষেপ করা দরকার।

১৯২০ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে বীরপাড়া চা বাগান ঘেঁষে তৈরি করা হয় দলগাঁও ক্লাব। পরে সেটি পরিচিত হয় ইউরোপীয়ান ক্লাব নামে। মূলত বিভিন্ন চা বাগানের ম্যানেজার ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই ছিলেন ওই ক্লাবের সদস্য। সেসময় একশো শতাংশ সদস্যই ছিলেন ব্রিটিশ। ব্রিটিশরা দেশ ছাড়ার দীর্ঘদিন পরও ইউরোপীয়ান ক্লাব ধরে রেখেছিল তার পশ্চিমি কালচার। কারণ, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তরাই-ডুয়ার্সের বিভিন্ন চা বাগানের কর্মকর্তার পদে ছিলেন ব্রিটিশ সাহেবরাই। তাসাটি চা বাগানের ম্যানেজার গিফটস, দলগাঁও চা বাগানের ম্যানেজার বেস্টার ফ্রিগ্যান্স, বীরপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার ডি ক্লার্ক, ডিমডিমা চা বাগানের ম্যানেজার অস্টিন, নাংডালা চা বাগানের ম্যানেজার গ্রেস্টন, দলমোর চা বাগানের ম্যানেজার টাউড, তুলসীপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার জি এ ক্র্যাকসেং, লঙ্কাপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার এইচ ম্যাকআর্থার, গ্যারগান্ডা চা বাগানের ম্যানেজার ডি ম্যাকলিউড, ধুমচিপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার এম টার্নার, হান্টাপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার ডব্লিউ জে ফার্গুসনের মতো অনেক সাহেবই নিয়মিত আসতেন ক্লাবে। পার্টিতে উপচে পড়ত পানপাত্র। ক্লাবের সামনের বিরাট মাঠে চুটিয়ে খেলতেন সাহেবরা।

একসময় দেশ ছাড়তে থাকেন সাহেবরা। মূলত, চিন-ভারত যুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন চা বাগানের মালিকানা পরিবর্তন হতে থাকে। বিভিন্ন চা বাগানের ম্যানেজার পদে আসতে থাকেন ভারতীয়রা। সিদ্ধার্থশংকর রায়ের ভাই সঞ্জয় রায়, এলাহাবাদ হাইকোর্টের তত্কালীন প্রধান বিচারপতির ছেলে হরিনারায়ণ গুট্টুর মতো ‘দেশি সাহেব’রা ডুয়ার্সের বিভিন্ন চা বাগানের ম্যানেজার পদে যোগ দিতে থাকেন। তবে, তখনও ক্লাবে ছিল ইউরোপীয়ান কালচার। এমনকি কয়েক বছর আগেও বিভিন্ন চা বাগানের কর্মকর্তারা গলফ খেলতে আসতেন ইউরোপীয়ান ক্লাবের মাঠে। তবে, ডানকানসের চা বাগানগুলিতে অচলাবস্থা দেখা দেওয়ার পর থেকেই একপ্রকার পরিত্যক্ত হয় দলগাঁও ইউরোপীয়ান ক্লাব। এখন আর কেউ পা রাখেন না ক্লাবে।

বীরপাড়া হাসপাতালের কাছেই বিরাট এলাকাজুড়ে রয়েছে ইউরোপীয়ান ক্লাবের বাড়ি ও মাঠ। তবে, অবহেলায় ঝোপঝাড়ে ঢেকেছে ক্লাবগৃহ। অয়ত্নে, মাঠে গজিয়েছে বড়ো বড়ো ঘাস। ক্লাবের জানালার ভাঙা শার্সি দিয়ে উঁকি দিলেই নজরে পড়ে ধুলোয় ঢাকা ভাঙাচোরা আসবাব। ইতিহাস গবেষক তথা অধ্যাপক দীনেশ রায় বলেন, এ ধরনের নিদর্শন ইতিহাসকে তুলে ধরে। গবেষণার ক্ষেত্রেও এগুলি মূল্যবান। তাই, এ ধরনের নিদর্শনগুলিকে সংরক্ষিত করা অত্যন্ত জরুরি।