দুয়ারে সরকার কর্মসূচিতে গিয়েও খালি হাতে ফিরছে বৃদ্ধা থেকে প্রতিবন্ধী

1281

রায়গঞ্জ: বেশ কয়েক বছর ধরে গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের দপ্তরে ঘুরেও মেলেনি প্রতিবন্ধি, বিধবা ও বার্ধক্য ভাতা। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য থেকে গ্রাম প্রধান অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিন্তু কেউই কথা রাখেনি। তাই আদৌ এই ভাতা মিলবে কিনা কেউই জানেন না। হেমতাবাদ ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন উন্নয়ন আধিকারিকের দপ্তরে মঙ্গলবার দেখা গেছে দুই অসহায় বৃদ্ধা বার্ধক্য ভাতার জন্য ধর্ণা দিয়েছেন।

বুধবার মালঞ্চা হাই স্কুল প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেল একই চিত্র। অঞ্চলের কয়েক শতাধিক বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, বিধবা ও প্রতিবন্ধী মানুষ ভাতার আশায় ক্যাম্পে ভিড় করেছেন। বছরের পর বছর অপেক্ষা করার পর আজ অনেক আশা নিয়ে বহুদূর থেকে সেখানে হাজির হয়েছিলেন। গ্রামের নেতারা আশ্বাস দিয়েছিলেন আজ সমস্যা মিটে যাবে। সেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন।

- Advertisement -

কিন্তু মানবিক, জয় জোহার ও জয় বাংলা ছাড়া এদিন অন্য কোনো ভাতার রেজিস্টশন মিলবে না বলে আশাহত হয়ে অনেকেই ফিরে যান। আবার অনেকের ভোটার কার্ডের সঙ্গে আধার কার্ডের মিল থাকায় কর্মীরা ফর্ম জমা নেননি। নারায়ণপুরের মঞ্জু দাসের আনুমানিক বয়স ৭৫ বছর। বিধবা ভাতা পান না। দেখা গেল তাঁর ভোটার কার্ডে বয়স রয়েছে ৪৫ বছর এবং খাদ্যসাথী প্রকল্পের কার্ডে বয়স রয়েছে ৫৪ বছর।

এদিন রেজিস্টশন না হওয়ায় মঞ্জু দেবী বলেন, ‘আমাকে তো আগে কখনও বলেনি। এক হাজার টাকা ভাতা হলে দুবেলা দুমুঠো ভাতের সংস্থান হতো। ভোটার কার্ড সংশোধন না করলে হবে না জানালো। অথচ গ্রামের মেম্বার বলেননি।‘

প্রভাতি বর্মণ বলেন, ‘ভাতার জন্য বরুয়া থেকে এসেছি। এসে শুনলাম আমার ভোটার কার্ডের বয়সের সঙ্গে আধার কার্ডের মিল নেই বলে ভাতা পরে হবে জানালেন। অনেকদিন ধরে গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে ব্লক অফিসে ঘুরছি ভাতার জন্য।‘

সিজগ্রামের প্রায় ৬৫ বছরের বৃদ্ধা বাসন্তী বর্মণও বার্ধক্য ভাতার জন্য নাম রেজিস্টশন করতে পারেননি। কারন তাঁর ভোটার কার্ড নেই, আছে আধার কার্ড। ভোটার কার্ড না হলে রেজিস্টশন হবে না বলে তিনি জানান।

সাধারণ শ্রেণিভূক্ত কমল পাল, তনু সাহা, মুক্তি সরকার সহ অনেকেই বার্ধক্য ও বৃদ্ধ ভাতার রেজিস্টশন করতে না পেরে ফিরে যান। প্রমীলা শীল, চম্পা রায় সহ আরও অনেক বিধবা মহিলার বয়স ৬০ বছর না হওয়ায় ঘুরে যান। তাদের দাবি, ‘আমাদের গ্রামের মেম্বার বলেছিলেন ৫০ বছর হলেই ভাতা মিলবে। বহুদূর থেকে এসেছিলাম। অন্যদিকে, এদিন গ্রামীণ সম্পদ কর্মীরা তাদের সাম্মানিক নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন।

তাদের অভিযোগ, ন্যায্য সাম্মানিক তাদের দেওয়া হচ্ছে না। দুয়ারে সরকার যাচ্ছেন, কিন্তু আমাদের সমস্যা দূর হচ্ছে না। প্রসেঞ্জিৎ পাল, ফারুখ আহমেদ, দীপক বর্মণ সহ প্রত্যেকেই এদিন ক্ষোভ উগরে দেন।

এদিন দুয়ারে সরকার কর্মসূচিতে দেখা গেল জেলা পরিষদের সেক্রেটারি থেকে বিডিও সহ অন্যান্য আধিকারিকদের। অনেকে ভাতার জন্য রেজিস্টেশন করতে এসে রেজিস্টশনের কাজ না হওয়ায় আধিকারিকদের কাছে ছুটে যান।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার রাজ্যের সর্বত্র শুরু হয়েছে দুয়ারে সরকার কর্মসূচি। সেই মতো বুধবার রায়গঞ্জ ব্লকের ১২ নং বরুয়া অঞ্চলের অন্তর্গত মালঞ্চা হাই স্কুল প্রাঙ্গণে বসেছিল দুয়ারে সরকারের কর্মসূচি। শিক্ষাশ্রী, খাদ্যসাথী, স্বাস্থ্য সাথী, তপশিলী ও উপজাতিদের পেনশন প্রদান সংক্রান্ত সহ একাধিক প্রকল্পের ১১ টি ক্যাম্প হয়। স্কুলের পশ্চিম প্রান্তে গাছের তলায় দেখা গেল তিনটি টেবিলে চলছে ফর্ম জমা নেওয়ার কাজ। অঞ্চলের ১০ জন গ্রামীণ সম্পদ কর্মীরা এই কাজ করছেন।

গ্রাম পঞ্চায়েতের বিভিন্ন সংসদ থেকে কয়েকশ অসহায় বৃদ্ধ, বৃদ্ধা এবং বিধবা মহিলারা নিজেদের নাম তালিকাভূক্ত করার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। সাধারণ শ্রেণিভুক্ত বৃদ্ধ, বৃদ্ধা ও বিধবাদের নাম নথিভূক্ত না হওয়ায় অনেকেই আবার ফিরে যাচ্ছেন।

হেমতাবাদ ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের দপ্তরে গিয়ে বেশ কয়েকজন অসহায় বৃদ্ধা ভাতার জন্য ধর্নায় বসেছিলেন। আজও সেই একই ছবি দুয়ারে সরকার কর্মসূচিতে দেখা গেল। এরা কেউ চার বছর, আবার কেউ পাঁচ বছর ধরে ভাতার জন্য দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। হচ্ছে হবে বলে শুধু মিলছে প্রতিশ্রুতি। এদিন ক্যাম্পে দেখা গেল স্বাস্থ্য সাথী, খাদ্য সাথী, শিক্ষাশ্রী সহ মোট ১১ টি কাউন্টার হয়েছে। কিন্তু ভিড় উপচে পড়ছে বিধবা, বৃদ্ধ ও বার্ধক্য ভাতার লাইনে।

বরুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপি প্রধান ধর্মেশ্বর বর্মন এদিন স্কুল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘ভোটের আগে সাধারন মানুষের মন পেতে সরকার এই ধরনের নাটক করছেন। সাধারণ মানুষের সমস্যার কোনো সুরাহা হবে না।‘

তবে ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক রাজু লামা থেকে জেলা পরিষদের সেক্রেটারি সকলেই এদিন সরকারি প্রকল্পগুলির গুনগান গেয়েছেন। জেলা পরিষদের সেক্রেটারি সঞ্জয় কুমার হাওলাদার জানান, অনেকদিন ধরেই ভাতা দেওয়া হচ্ছে। কয়েকদিন আগে বিডিও সাহেব ব্লক থেকে ২৫০০ মানুষকে ভাতা করে দিয়েছেন। আজ আবেদনপত্র নেওয়া হচ্ছে। যাদের ৬০ বছর হয়েছে তাঁরা আবেদন করতে পারবেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের যে গাইড লাইন আছে সেই মতো আমরা প্রসেসিং করব। এই কাজ চলতে থাকবে। কোনো সমস্যা হবে।‘ তিনি আরও বলেন, ‘তপশিলী জাতি ও আদিবাসীরা ৬০ বছর হলেই ভাতার জন্য আবেদন করতে পারবেন। ১০০ শতাংশ আবেদনকারীরা ভাতা পেয়ে যাবেন। যারা সাধারণ শ্রেণিভুক্ত তাদের আবেদন পত্রগুলি প্রস্তাব হিসেবে পাঠানো হবে। এরপর যেভাবে নির্দেশ আসবে সেইমতো আবেদনপত্রগুলি মঞ্জুর হবে।‘