পঞ্চানন ভক্তির প্রতিযোগিতায় রাজনীতির স্পর্শ

116

গৌরহরি দাস, কোচবিহার : পঞ্চানন বর্মার কদর এখন রাজনীতির কারবারিদের কাছে। রাজবংশী এই সমাজ সংস্কারকের বন্দনায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চরমে উঠেছে। রবিবার ছিল তাঁর জন্মদিন। সোমবার সরকারি উদ্যোগে ঘটা করে রায়সাহেব ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার মূর্তি প্রতিষ্ঠা হল। কলকাতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মূর্তিটির ভার্চুয়াল আবরণ উদ্বোধন করলেন। কোচবিহারে পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের পাশে মূর্তিটি স্থাপন করা হল। নয় ফুট উচ্চতার মূর্তিটি নির্মাণে সরকারি কোষাগার থেকে খরচ হয়েছে নয় লক্ষ টাকা। খুব শীঘ্র রায়সাহেবের আরও একটি মূর্তি প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে কোচবিহারে। এই মূর্তিটি তৈরি হবে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি কোচবিহারে বিজেপির জনসভায় এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা ওই ঘোষণা করে গিয়েছেন। এজন্য কেন্দ্রীয় কোষাগার থেকে ২৫০ কোটি টাকা খরচ করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। এছাড়া কোচবিহারের মদনমোহন মন্দির ও কামতেশ্বরী মন্দিরের সঙ্গে পঞ্চাননের জন্মস্থান খলিসামারিকে যুক্ত করে নতুন টুরিজম সার্কিট তৈরি করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পঞ্চানন বর্মার জন্মদিনে রবিবার কোচবিহারে পঞ্চাননের অন্য একটি মূর্তিতে মাল্যদান করে গিয়েছেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর ও কেন্দ্রীয় পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রহ্লাদ সিং প্যাটেল।

আপাত চোখে দুটি উদ্যোগ রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের হলেও এর পিছনে আছে দুই শাসকদলের প্রতিযোগিতা। মনে করা হচ্ছে, রাজবংশী ভোট প্রভাবিত করতে পঞ্চাননের মতো মনীষীকে নিয়ে এই রাজনৈতিক টানাটানি শুরু হয়েছে। সব দলই মরিয়া পঞ্চানন বর্মার প্রতি কে কত শ্রদ্ধাশীল, তা প্রমাণে। বিজেপি ও তৃণমূলের এই দড়ি টানাটানি নিয়ে দুই দলের নেতারা অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। বিজেপির কোচবিহার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, আমাদের উত্তর-পূর্ব ভারতে যতজন মনীষী আছেন, তাঁদের অন্যতম ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা। তাঁর অবদান, ইতিহাস বিলুপ্তির পথে ছিল। আমরা বিজেপির পক্ষ থেকেই প্রথম এ নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করি। এখন আমরা ক্ষমতার দোরগোড়ায় বলে সবাই পঞ্চাননকে নিয়ে প্রচার করছে। তৃণমূল আমাদের অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায় বলেন, কারা পঞ্চানন বর্মাকে নিয়ে মাতামাতি করছে, আমাদের জানা নেই। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পরই পঞ্চাননের নামে বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করেছেন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে পঞ্চাননের জীবনী শিক্ষা, অবদানকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। পঞ্চানন বর্মাকে নিয়ে বহু কাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে সরকার করেছে। ধারাবাহিকভাবে করছে। বিজেপি এখন করছে ভোটকে সামনে রেখে, ভোটের লক্ষ্যে। এটাই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পার্থক্য। ভোটের লক্ষ্যে তৃণমূল নতুন করে কিছু করছে না।

- Advertisement -

রাজবংশী সংগঠনগুলিও এই দড়ি টানাটানিতে দুই পক্ষকে সমর্থন করছে। তবে দড়ি টানাটানি নিয়ে কোনও পক্ষেরই কোনও আপত্তি নেই। গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের সরকার সমর্থক গোষ্ঠীর শীর্ষনেতা বংশীবদন বর্মন বলেন, পঞ্চানন বর্মা রাজবংশী সমাজের আইকন। সমাজ সংস্কারক। ওঁর পরিচয় এতদিন তেমনভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। রাজ্য সরকার তাঁর জন্মদিনে ছুটি ঘোষণা করেছে। আরও কিছু কাজ করেছে। যে কারণে তাঁকে সবাই জেনেছে এতদিনে। এজন্য অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি এখন রাজবংশী ভোটের লক্ষ্যে পঞ্চাননকে নিয়ে মাতামাতি শুরু করেছে। তবে রাজবংশীরা বোকা নয়। ভোটের বাক্সে তারা উপযুক্ত জবাব দেবে। গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের অনন্ত মহারাজের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী আবার বিজেপির সমর্থক। ওই গোষ্ঠীর নেত্রী নমিতা বর্মনের আবার বক্তব্য, ভোটের লক্ষ্যে কেউ রাজনীতি করছে কি না, আমার জানা নেই। পঞ্চানন বর্মা মহান মানুষ, সমাজ সংস্কারক। উনিই প্রথম নারায়ণী সেনা নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সম্মান ওঁর অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিল। তবে এখন যে কেউ, তাঁকে সম্মান জানাক না কেন, তা আমাদের ভালো লাগছে।

যদিও কোচবিহারের রাজ পরিবারের উত্তরাধিকারীরা পঞ্চাননকে নিয়ে এই দড়ি টানাটানিতে বিরক্ত। কোচবিহার রয়্যাল ফ্যামিলি সাকসেসর্স ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সহ সম্পাদক কুমার মৃদুলনারায়ণ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলি পঞ্চানন বর্মাকে নিয়ে এখন যেভাবে মাতামাতি করছে, তাতে মনে হচ্ছে রাজবংশী ভোটের লক্ষ্যে ওরা এসব করছে। কোচবিহার ক্ষত্রিয় সোসাইটির সভাপতি অন্নময়ী অধিকারী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলি হয়তো এখন উপলব্ধি করতে পারছে যে, পঞ্চানন সম্মান পাওয়ার উপযুক্ত। যাই হোক উনি সম্মান তো পাচ্ছেন। এটাই ভালো লাগছে। রায়সাহেব পঞ্চানন বর্মা রাজবংশী সমাজ ও শিক্ষিত মানুষের কাছে বরাবরই শ্রদ্ধেয়। কিন্তু তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলিকে আগে তেমন মাতামাতি করতে দেখা যায়নি। সে কারণেই মনে করা হচ্ছে, ভালোবেসে নয়, এই মাতামাতির পিছনে রয়েছে পঞ্চানন সম্পর্কে রাজবংশী সমাজের আবেগ উসকে ভোটের লক্ষ্যে ব্যবহার। কে কত রাজবংশী দরদি, তার প্রতিযোগিতা চলছে যেন। উভয় দলই যেভাবে পঞ্চানন বর্মাকে নিয়ে তারাই প্রথম কাজ শুরু করেছিল বলে দাবি করছে, তাতে এই ধারণা আরও দৃঢ় হচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে।

বাম আমলে কোচবিহার শহরে ঠাকুর পঞ্চানন মহিলা মহাবিদ্যালয় নামে কলেজ তৈরি হয়েছিল। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ২০১২ সালে কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। এছাড়া গত কয়েক বছরে তৃণমূল বা বিজেপি, কোনও রাজনৈতিক দলকেই পঞ্চানন বর্মাকে নিয়ে তেমন কিছু উদ্যোগ নিতে বা এমন উন্মাদনা তৈরি করতে দেখা যায়নি। বিধানসভা নির্বাচনের আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্মদিন পড়ে যাওয়ায় মাতামাতি যেন আরও বেড়েছে। রাজ্য সরকার জন্মদিনটিতে ছুটি ঘোষণা করেছে। তাঁর জন্মস্থান মাথাভাঙ্গার কাছে খলিসামারিতে পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তৈরি করল রাজ্য সরকার। কিছুদিন আগে কোচবিহারে পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার নামকরণ করা হয়েছে পঞ্চানন নগর।