প্রাক্তন কেএলও জঙ্গির হাতেই এলাকার নিরাপত্তা

319

গৌরহরি দাস, কোচবিহার : একটা সময় তাঁর একের পর এক নাশকতার ঘটনা সবাইকে প্রচণ্ডভাবে আতঙ্কিত করে তোলে। সিপিএমের অনেক বাঘা বাঘা নেতার পাশাপাশি পুলিশ আধিকারিকদের অনেকের রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। দুই হাতে বিদ্যুৎবেগে অভ্রান্ত লক্ষ্যে গুলি চালাতে সিদ্ধহস্ত পুলস্ত্য বর্মনকে ধরতে রাজ্য পুলিশের তো বটেই ভারত ও ভুটানের সেনাবাহিনীরও নাজেহাল অবস্থা হয়েছিল। সেই পুলস্ত্যবাবু এখন রাজ্যরক্ষী। কোচবিহারের শীতলকুচি থানায় স্পেশাল হোমগার্ড পদে চাকরি করছেন। শীতলকুচি থানায় শুধু তিনি একাই নন, পুলস্ত্যবাবু সহ সেখানে তিনজন প্রাক্তন কেএলও জঙ্গি ও পাঁচজন কেওলও লিংকম্যান আজকাল হোমগার্ড পদে কর্মরত। সম্প্রতি রাজ্য সরকার প্রাক্তন কেএলও জঙ্গি ও লিংকম্যানদের নিয়োগপত্র দেওয়ার পর থেকে পুলস্ত্যবাবুরা চাকরি শুরু করেছেন। নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ পাওয়ায় তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

মাথাভাঙ্গা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে পার্ট ওয়ান পাশ করার পর পুলস্ত্য বর্মন হঠাৎ কেন কেএলও-তে নাম লেখালেন? পুলস্ত্য জানান, শীতলকুচির খলিসামারি গ্রাম পঞ্চায়েতের ছোট খলিসামারি গ্রামে তাঁর জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষা সেখানেই। মাথাভাঙ্গা হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ। ১৯৯১-৯২ সাল মাথাভাঙ্গা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে পার্ট ওয়ান পাশ করার পর তিনি কেএলওর সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি বলেন, ১৯৮৫-৮৬ সালে আলিপুরদুয়ারে একটি আন্দোলন হয়েছিল। আমি তখন ক্লাস নাইনে। আমিও সেখানে গিয়েছিলাম। পুলিশ ও সিপিএমের গুন্ডাবাহিনী ওই আন্দোলনে শরিক পড়ুয়াদের ব্যাপক মারধর করে। ঘটনাটি মনে গভীরভাবে দাগ ফেলে। তারপর থেকেই আমি প্রতিবাদের উপায় খুঁজতে থাকি। কলেজে ওঠার পর বিভিন্ন কলেজের পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অল কামতাপুরি স্টুডেন্স ইউনিয়ন গঠন করি। কেএলওর সুপ্রিমো জীবন সিংহও তাতে ছিলেন। তিনি তখন শিলিগুড়ি কলেজের ছাত্র ছিলেন। ১৫-২০ জন ছাত্র মিলে জল্পেশ মন্দিরে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই এবং এই ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিই। কামতাপুরি ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস আমাদের আন্দোলনের বিষয় ছিল। আমাদের আন্দোলন এরপর গণতান্ত্রিক পথে এগোতে থাকে। পুলিশ ও সিপিএম আমাদের উপর যেখানে-সেখানে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালাতে থাকে। আমাদের মঞ্চ ভেঙে দেওয়া হয়। ১৯৯২-৯৩ সালে কুমারগ্রামে আমরা পথ অবরোধ করেছিলাম। সেই সময় পুলিশ ব্যাপকভাবে লাঠিচার্জ করে। আন্দোলন চালাতে হলে রুখে দাঁড়াতে হবে বলে এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিই। এভাবেই আমাদের কেএলও গঠন ও হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া। ১৯৯৬ সালের প্রথম দিকে অসমে গিয়ে আমরা আলফার কাছ দুই মাসের প্রশিক্ষণ নিই। ওই দলে আমি ছাড়াও জীবন সিংহ, হর্ষবর্ধন বর্মা, মিল্টন বর্মা, টারজান, লক্ষ্মণ সহ ২০ জন ছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসে আমরা অত্যাচারী সিপিএম নেতাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিই।

- Advertisement -

পুলস্ত্যবাবু বলেন, ২০০৩ সালে অপারেশন ফ্ল্যাশ আউটের সময় ভুটান পাহাড়ে আমরা টানা ১৩ দিন ধরে ভারত ও ভুটানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করি। এরপর আত্মগোপন করে ছদ্মবেশে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের রংপুরে আশ্রয় নিই। আমার সঙ্গে জীবন সিংহ ও অবিনাশ অধিকারীও ছিলেন। সেখানে আমি সুরেশ ও জীবন সিংহ নরেশ নাম নিই। ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারতীয় গোয়েন্দাবাহিনী ও বাংলাদেশের ক্যাডাররা আমাকে গ্রেপ্তারের পর তিন বছর জেল খাটি। পরবর্তীতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও প্রচণ্ড আর্থিক সমস্যা ছিল। এই অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরি দিয়ে আমাদের যে উপকার করলেন তা কোনওদিন ভুলব না।