উজ্জ্বল রায়, ধূপগুড়ি : পেট চালানোর তাগিদে তিনি মাঠেঘাটে কাজ করেন। ধান বোনার পর সেই ধান কাটা, গোরুকে খড় দেওয়া, পুকুরে মাছ ধরার মতো কাজ তাঁর নিত্যসঙ্গী। তবে এ আর এমন কী! সংসার চালাতে কত মানুষই তো এসব করেন। কিন্তু সেই মানুষটা যদি দুবারের বিধায়ক হন? তবে তা চোখ কপালে তোলার মতোই বইকি। মাগুরমারি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের পশ্চিম মল্লিকপাড়ার বাসিন্দা লক্ষ্মীকান্ত রায় ২০০১ সাল থেকে টানা ১০ বছর ধূপগুড়ির বিধায়ক ছিলেন। অন্যান্য জায়গার প্রাক্তন বিধায়কদের বিলাসবহুল জীবন কাটাতে দেখা গেলেও লক্ষ্মীকান্তবাবু অবশ্য গ্রামের আর পাঁচটা মানুষের মতোই সহজসরল জীবন কাটান। এনিয়ে প্রাক্তন বিধায়কের মনে অবশ্য কোনো ক্ষোভ নেই। তবে দলের নেতা-কর্মীরা আজকাল আর তাঁর কোনো খোঁজ নেন না বলে তাঁর মনে দুঃখ অনেকটাই। সিপিএমের বড়ো বড়ো নেতারা ধূপগুড়িতে আসেন। দলের বড়ো বড়ো অনুষ্ঠানও হয়। কিন্তু সেগুলিতে লক্ষ্মীকান্তবাবুকে কখনোই দেখা যায় না। পার্টির কাছে তিনি পুরোপুরি ব্রাত্য বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ। লক্ষ্মীকান্তবাবুর দল অবশ্য অভিযোগ মানতে চায়নি। এলাকার সিপিএম নেতা জয়ন্ত রায় বলেন, বামেদের সমস্ত বিধায়ক সাধারণের জন্য কাজ করেন। তাই তাঁরা সাধারণ মানুষের মতোই জীবন কাটান। দলের তরফে প্রাক্তন বিধায়কের কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ উঠলেও জয়ন্তবাবুর বক্তব্য, একথা ঠিক নয়। আমরা নিয়মিতভাবে লক্ষ্মীকান্তবাবুর খোঁজখবর নিয়ে থাকি।

ছাত্রজীবন থেকেই কমিউনিস্ট ভাবধারায় বিশ্বাসী লক্ষ্মীকান্তবাবু ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এলাকার সিপিএম প্রধান ছিলেন। এরপর থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি টানা ধূপগুড়ির পঞ্চায়েত সমিতির সহসভাপতির পদ সামলান। ২০০১ সালে তিনি বিধানসভা ভোটে দাঁড়ান। ওই ভোটে জয়ী হয়ে তিনি ওই বছর থেকে শুরু করে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর ধূপগুড়ির বিধায়ক পদ সামলান। এই সময়কালে তিনি উন্নয়নমূলক বহু কাজেরই ফিতে কেটেছেন। ওই সমস্ত ফিতে কাটতে ব্যবহার করা নিজের দুহাত দিয়ে তিনি অবশ্য আজকাল ধান কাটেন, মাছ ধরার জাল বোনেন। ধান লাগানো থেকে ধান কাটা পর্যন্ত সমস্ত কাজই নিজেই করেন। বাড়িতে কোনো পাকা ঘর নেই। মামুলি এক টিনের ঘরে ছেলেকে নিয়ে তাঁর বসবাস। এসব দেখে এলাকার মানুষ বেশ কষ্ট পান। গ্রামবাসী নির্মল রায় বলেন, লক্ষ্মীকান্তবাবু জীবনের বেশিরভাগ সময় রাজনীতি করে কাটালেও আজকাল নিজের দলের কাছেই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। যে মানুষটি একসময় ধূপগুড়িতে কঠিন পরিস্থিতির মাঝে দল চালাতেন সেই মানুষটি এখন রোজ সকালে আর দশজনের মতো বাড়ির কাজ সেরে মাঠঘাটের কাজের তদারকি করেন। এমনটা আমাদের খুবই কষ্ট দেয়।

সম্প্রতি বাড়িতে গিয়ে লক্ষ্মীকান্তবাবুকে মাছ ধরার জাল বুনতে দেখা গেল। এনিযে প্রশ্ন করা হলে প্রবীণের বক্তব্য, কোনো বিধায়ক যদি ঠিকমতো কাজ করে থাকেন তবে তাঁর তো বাড়তি কিছু থাকার কথা নয়। তবে কেউ যদি রাজনীতিকে ব্যবসার চোখে দেখে তবে আলাদা ব্যাপার। আমি গ্রামের মানুষ। তাই সংসার চালাতে আমাকে চাষাবাদ, মাছ ধরা, জাল বোনার মতো বহু কাজই করতে হয়। এ নিযে কোনো আক্ষেপ নেই। তবে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া দলের কেউ আর তাঁর খোঁজখবর রাখেন না বলে তাঁর আক্ষেপ যথেষ্টই। প্রাক্তন বিধায়ক হিসাবে দলের কোনো অনুষ্ঠান তো বটেই, সরকারি কোনো অনুষ্ঠানেও ডাক না পাওয়ায় লক্ষ্মীকান্তবাবু ক্ষোভ জানান। বলেন, নিজের জন্য নয়, এই অনুষ্ঠানগুলিতে ডাক পেলে মানুষের জন্য আরও কাজের সুযোগ পেতাম।