অতীতের চোরাশিকারিদের হাতে এখন সুরক্ষিত মানস জাতীয় উদ্যান

323

গুয়াহাটি : ওই দেখুন, গন্ডার। জিপ সাফারিতে বেরিয়ে অনেকক্ষণ কিছু দেখতে না পেয়ে মনে মনে দমে গিয়েছিলাম। গাইডের আঙুলের ইঙ্গিতে দূরে তাকাতেই চোখে পড়ল একটি একশৃঙ্গ গন্ডার। একমনে ঘাস চিবিয়ে যাচ্ছে। মাথায় বসে আছে একটি অক্সপেকার। মাথা ঝাঁকিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করছে বটে মাঝেমধ্যে। তা নিয়ে তেমন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হল না গন্ডারমশাইয়ের। আমাদের দিকে ফিরেও চাইল না। দূরে উদাসী গ্রেট ইন্ডিয়ান হর্নবিল বা ধনেশ। গোরুচরা নদীর ধারে জঙ্গলে অতিথিদের দিকে তাকিয়ে বার্কিং ডিয়ার।

উত্তর-পশ্চিম অসমে মানস জাতীয় উদ্যানে গিয়েছিলাম এই বছরের জানুয়ারিতে। গুয়াহাটি থেকে প্রায় ১৭৬ কিলোমিটার দূরে বরপেটা জেলার উত্তরাঞ্চলে, ভুটান পর্বতের পায়ের নীচে এই জাতীয় উদ্যানটি বেশ কয়েক বছর আগে (১৯৮৫) ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা পেয়েছে। ১৯৭৩ সালে মানস ব্যাঘ্র প্রকল্প তৈরি হয়। তখন এর আয়তন ছিল ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৯০ সালে কাহিতমা, কোকিলাবাড়ি ও পানবাড়ি সংরক্ষিত অরণ্য মানসের সঙ্গে যুক্ত করে মানস জাতীয় উদ্যানের জন্ম হয়। মানসের মতো একইসঙ্গে ইউনেসকো হেরিটেজ সাইট, বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ, টাইগার রিজার্ভ এবং এলিফ্যান্ট রিজার্ভ-এর শিরোপা বিশ্বের আর কোনও অরণ্যের নেই। ইউনেসকোর মতে, ভারতের সবচেয়ে বেশি বিপন্ন ও বিরল প্রজাতির প্রাণীকে আশ্রয় দিয়েছে মানস। উত্তরে মানস নদী, ওপারে ভুটান, দক্ষিণে বাঁশবাড়ি, পালসিগুড়ি এবং কাটাঝাড়গাঁও, পশ্চিমে সংকোশ নদী থেকে পূর্বে ধানসিড়ি নদী পর্যন্ত মানস জাতীয় উদ্যান বিস্তৃত। পাহাড়, বিস্তীর্ণ উর্বর ঘাসজমি, জঙ্গল আর নদী নিয়ে অপরূপ শোভা এই উদ্যানের। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলে প্রায়ই দেখা মেলে বাঘ, হাতি, গন্ডার, পিগমি হগ, কালো চিতাবাঘ, মেঘলা চিতাবাঘ, গোল্ডেন ও লেপার্ড ক্যাট, সিভেট, বেঙ্গল ফ্লোরিকান, হরেক হরিণ, কালার্ড ফ্যালকনের মতো প্রথম তফশিলিভুক্ত ২১ রকম বিপন্ন পশুপাখির। এছাড়া বিরল প্রজাতির বহু গাছপালাও রয়েছে মানসে, যা প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছে খুব আকর্ষণীয়।

- Advertisement -

প্রায় ঘণ্টা পাঁচেক ঘোরাঘুরির পর হলুদ ঘাসের বনে একটি গন্ডারকে দেখে সকলেই খুশি। মধ্যাহ্নভোজ সারতে সারতে গল্প হচ্ছিল। দুদশক আগেও মানস জাতীয় উদ্যানের এই অবস্থা ছিল না। একসময় এই জঙ্গলকে বিরল প্রজাতির পশুপাখির নয়, জঙ্গি ও চোরাশিকারিদের অভয়ারণ্য বলা হত। একে তো নদী পেরোলেই ভুটান। তার ওপর, পাশেই বোড়োল্যান্ড আন্দোলনের উত্তাপ। আটের দশকে জনজাতি আন্দোলনের সময় উত্তর-পশ্চিম অসমের মানস বনাঞ্চল চোরাশিকারিদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল। অবাধে চলত গাছকাটা আর পশুহত্যা। দামি কাঠ থেকে শুরু করে হাতির দাঁত, গন্ডারের শিং, বাঘ-হরিণের চামড়া, পাখির মাংস, সবই ওপারের ভুটানে চড়া দামে বিক্রি হত। আন্দোলনেরও তো খরচ আছে। ফলে বিক্রয়করহীন চোরাশিকারের ব্যবসা জাঁকিয়ে বসেছিল নজরদারিহীন মানসকে কেন্দ্র করে। দ্রুত বাস্তুতন্ত্র বিঘ্নিত হয় মানস উদ্যানের।

১৯৮০ সালে শতাধিক গন্ডার থাকলেও ২০০৩-এ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় মানস জাতীয় উদ্যান থেকে। এই সময় চোরাশিকারিদের হামলায় মৃত্যু হয় অন্তত ৬ জন বনকর্মীর। বন দপ্তরের কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ থেকে স্পষ্ট, সেই সময় চোরাশিকারিদের কতটা দাপট ছিল এলাকায়। ১৯৮৫ সালে ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তকমা পাওয়ার পরই যেন অধঃপতন শুরু হয় মানস জাতীয় উদ্যানের। ১৯৯২ সালে মানসকে বিপন্ন ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ থেকে বোড়ো জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ, বোড়োল্যান্ড চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর দিনবদল শুরু মানসের। পথ চলা শুরু হল বোড়ো স্বশাসনের। হাগ্রামা মহিলারির নেতৃত্বে জঙ্গিরা সরকারের শরিক হওয়ার পর তাঁরাই অরণ্যরক্ষার ভার হাতে তুলে নেন। চোরাশিকারির দল আত্মসমর্পণ করে। অরণ্য রক্ষায়, পর্যটন সম্প্রসারণে ও চোরাশিকার রোধে তারাই জোটবদ্ধ হয়। বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল (বিটিসি)-এর সদস্যরা দায়িত্ব নেন স্থানীয় গ্রামবাসী ও চোরাশিকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্তদের বুঝিয়ে অরণ্যের অধিকার ফিরিয়ে আনার। সেই সঙ্গে মানসের হারানো প্রাণীদের ফিরিয়ে আনতে মাঠে নামে আইএফএডব্লিউ, ডব্লিউটিআই। কাজিরাঙ্গা, পবিতরা থেকে গন্ডার, বাঘ মানসে ফেরে। দফায় দফায় হাতি আনা হয় কাজিরাঙ্গা থেকে।

আটের দশকের কুখ্যাত চোরাশিকারি বুদ্ধেশ্বর বোড়োকে সেই সময় একটি হাত খোয়াতে হয়েছিল বাঘের পাল্লায় পড়ে। তিনি বলছিলেন, সেসময় ব্যক্তিগত লাভ ছাড়া কিছু বুঝতাম না। বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিলের প্রতিনিধিরা আমাদের প্রথম বলেছিলেন, জঙ্গল না থাকলে আমরা থাকব না। আমাদের মতো বনবাসী, বনজীবী মানুষ কীভাবে জঙ্গল বাঁচিয়ে আরও ভালোভাবে বাঁচতে পারে, সেটা ওঁরাই আমাদের শিখিয়েছিলেন। আমরা বনভূমি ও বন্যপ্রাণকে এখন ভালোবাসতে শিখেছি। আমরা বনবাবুদের কাছে কৃতজ্ঞ। মানস মাওজিজেন্দ্রি ইকোটুরিজম সোসাইটি (এমএমইএস)-র প্রধান কালেন বসুমাতারি বললেন, গত দেড় দশক চোরাশিকার থেকে বনরক্ষা, নানা বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে জঙ্গলের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছি। চোরাশিকারিদের অপরাধের পথ থেকে সরিয়ে বনরক্ষী বাহিনীতে যুক্ত করতে পারলে ট্রফি জেতার আনন্দ হয়। যারা ছিল বনাঞ্চলের শত্রু, আজ তারাই বনাঞ্চল বাঁচানোর যুদ্ধে প্রধান শক্তি। এঁরাই বিপন্ন তকমা মুছে ফেলেছে মানসের।