ভুয়ো কর্মী পুষে টাকা আত্মসাৎ, কোচবিহার পুরসভায় চরম বেনিয়ম

172

গৌরহরি দাস, কোচবিহার : অস্থায়ী কর্মীদের মাইনে দিতে কোচবিহার পুরসভার মাসে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা খরচ হয়। কিন্তু পুরসভায় কতজন অস্থায়ী কর্মী আছেন, তা কারও জানা নেই। গোড়ার দিনের চেয়ারম্যান থেকে পুরসভার কোনও আধিকারিকই আজ পর্যন্ত এই প্রশ্নের ঠিকমতো উত্তর দিতে চাননি। আর এই সূত্রেই পুরসভার অস্থায়ী কর্মীদের সংখ্যা নিয়ে গোড়া থেকেই একটা সন্দেহ রয়েছে। এই কর্মীদের মাইনের জন্য খরচ হিসাবে যে টাকা দেখানো হয় তার একটি বড় অংশই পুরসভার ক্ষমতায় থাকা দলের নেতাদের পকেট ভারী করে আসছে বলে অভিযোগ। ভুয়ো কর্মীদের আড়ালে আড়ালে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়মিতভাবে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এনিয়ে উত্তরবঙ্গ সংবাদের তরফে খোঁজখবর শুরু করতেই বিষয়টি মেটাতে পুরসভা উদ্যোগী হয়েছে। অস্থায়ী কর্মীদের বিষয়ে স্বচ্ছতা আনতে পুরসভা এই কর্মীদের তালিকা শুরু করেছে। কোচবিহার পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান তথা কোচবিহারের সদর মহকুমা শাসক রাকিবুর রহমান বলেন, অস্থায়ী কর্মীদের বিষয়ে স্বচ্ছতা আনতে নতুন করে তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছি। এজন্য পুরসভার প্রতিটি দপ্তরের প্রধানদের কাছ থেকে তাঁদের অধীনে কর্মরত অস্থায়ী কর্মীদের সংখ্যা ও ওই কর্মীদের নাম, ঠিকানা-পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এভাবে যে তালিকা তৈরি হবে তাতে ঠাঁই মেলা কর্মীরাই মাইনে পাবেন। অস্থায়ী কর্মীদের চার-পাঁচ মাসের বকেয়া মাইনেও ধীরে ধীরে মেটানোর চেষ্টা করা হবে। পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর সদস্য রাহুল রায় বলেন, ভুয়ো কর্মীদের পিছনে খরচ ঠেকানোর পাশাপাশি যাঁরা পুরসভায় কাজ করছেন তাঁদের যাতে সঠিক মূল্যায়ন হয়, সেদিকে আমাদের নজর রয়েছে।

- Advertisement -

পুরসভার প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা সিপিএমের মহানন্দ সাহা বলছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এতদিন পুরসভার চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থে বা দলীয় স্বার্থে অস্থায়ী কর্মীদের নামের তালিকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। বহুদিনের পুরোনো এই প্রবণতা মেটাতে পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলী যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি।

অস্থায়ী কর্মীদের পিছনে কোচবিহার পুরসভা মাসে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা খরচ করে। এই কর্মীরা মাসে আড়াই-তিন হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ আট-দশ হাজার টাকা পর্যন্ত মাইনে পান। গড়ে পাঁচ হাজার টাকা মাইনে ধরা হলে ৫০ লক্ষ টাকার হিসাবে পুরসভায় প্রায় এক হাজার অস্থায়ী কর্মী থাকার কথা। কিন্তু তা কি আদৌ আছে? সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, পুরসভার কাছে এই সংখ্যক কর্মী থাকলে রাজার শহর কোচবিহারের সোনার মতো ঝাঁ চকচকে থাকার কথা।

শহরের অধিকাংশ নর্দমা বেশিরভাগ সময় আবর্জনায় বুজে থাকলেও তা থাকার কথা নয়। সামান্য বৃষ্টিতেই বাসিন্দাদের বাড়িঘরে জল ঢুকে পড়ে। শহরের যেখানে-সেখানে জমে থাকা আবর্জনায় দূষণ ছড়াচ্ছে। শ্রমিক সমস্যার জেরে এসব কাজ করা যাচ্ছে না বলে পুরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিরা বারে বারে বলে আসছেন। এর জেরে বিভিন্ন সময় পুরসভার বিরুদ্ধে বাসিন্দাদের ক্ষোভ চরমে উঠেছে। পুরসভাকে নানা সময়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। শহরের এই পরিস্থিতি হওয়ায় বারবার অস্থায়ী কর্মীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু কোনওবারই উত্তর মেলে না। আর এই সূত্রে বাসিন্দারা বিভিন্ন সময় পুরসভার দায়িত্বে থাকা দলগুলির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়েছেন।

কোচবিহার সদরের মহকুমা শাসক রাকিবুর রহমান সম্প্রতি কোচবিহার পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পান। তারপর থেকেই তিনি শহরের দীর্ঘদিনের নিকাশি সমস্যা মেটানোর পাশাপাশি আবর্জনা সাফাইয়ের কাজে নজর দিয়েছেন। পাশাপাশি, অস্থায়ী কর্মীদের তালিকা গড়ার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন তা যাতে ফলপ্রসূ হয় সেই দাবিতেও তাঁরা সরব হয়েছেন।