ডালখোলা পুরভোটে ফ্যাক্টর কাটমানি আর কমিশন

অরুণ ঝা, ডালখোলা : পুরসভার আসন্ন নির্বাচনে ওয়ান ম্যান শো নিয়ে গোষ্ঠী কাজিয়া, স্বজনপোষণ, কাটমানি এবং উন্নয়নের কাজের নামে কোটি কোটি টাকার লুঠতরাজের অভিযোগ কাটিয়ে ওঠাই ডালখোলা পুরসভায় এখন তৃণমূল নেতত্বের কাছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিরোধীরা নয়, তৃণমূলের বিদায়ি বোর্ডের খতিয়ানই পুরভোটে তৃণমূলকে এখানে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ১৬ আসনের ডালখোলা পুরসভা দখল করা তাই এবার খুব সহজ হবে না বলেই মনে করছেন তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতাদের একটা বড়ো অংশ। প্রাক্তন চেয়ারম্যন তথা তৃণমূলের টাউন সভাপতি তনয় দে রাখঢাক না করে কঠিন এই পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি তাঁরা মানুষের কাছে স্বচ্ছ বোর্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এখন থেকেই যেতে শুরু করেছেন। তবে পুরসভার বিদায়ি চেয়ারম্যান সুভাষ গোস্বামী টাউন সভাপতির সঙ্গে সমহত নন। তাঁর মতে, এসব অভিযোগ বিরোধীদের চক্রান্ত। গোষ্ঠী কাজিয়ার কথা স্বীকার করলেও এখন সেই সমস্যা মিটে গিয়েছে বলে দাবি করেছেন সুভাষবাবু।

গত পুরভোটে কংগ্রেস ১০টি ওয়ার্ডে জিতে ডালখোলা পুরসভার ক্ষমতা দখল করে। সিপিএম ৪টি এবং তৃণমূল ২টি ওয়ার্ড দখল করেছিল। সুভাষ গোস্বামী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে পুরবোর্ড তৃণমূলের হাতে যায়। এখন ১৫ জন বিদায়ি কাউন্সিলার তৃণমূলে রয়েছেন। ২০১৮ সালে বোর্ডের মেয়াদ শেষ হলে রাজ্য সরকার ভোট না করিয়ে প্রশাসক বসিয়ে দেয়। আগামী এপ্রিল বা মে মাসে রাজ্যের অন্য পুরসভার সঙ্গেই ডালখোলা পুরসভারও ভোট হবে। ফলে শাসক থেকে বিরোধী সব পক্ষই ভোটের প্রস্তুতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। গত লোকসভা ভোটে ডালখোলা পুর এলাকা থেকে বিজেপি পাঁচ হাজারেরও বেশি ভোটে লিড পেয়েছিল। সেই পরিসংখ্যান মাথায় রেখে তারাও ডালখোলা পুরভোট নিয়ে কোমর কষছে।

- Advertisement -

ডালখোলা পুরসভা গঠনের পর থেকেই এখানকার মানুষ চেয়ারম্যান পদ নিয়ে আস্থা-অনাস্থার খেলা দেখে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। উন্নয়নের অজুহাতে কংগ্রেস পুরবোর্ড তৃণমূলে যোগ দিলেও উন্নয়ন বিশবাঁও জলেই থেকে গিয়েছে। উন্নয়নের নামে স্বজনপোষণ, কাটমানি, কমিশনের কারবার যে রমরমিয়ে চলেছে তা ডালখোলার মানুষের কাছে ওপেন সিক্রেট। শহরের যেকোনো গলিতে, চায়ের দোকানে কান পাতলেই এই গল্প শোনা যাবে। শহরের নিকাশি, রাস্তাঘাট, পরিস্রুত পানীয় জল থেকে শুরু করে জবরদখল উচ্ছেদ নিয়ে কাজের নজির নেই বললেই চলে। এসব নিয়ে পুর এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ। আজও ডালখোলায় ঢুকলে একে পুর এলাকার বদলে গ্রামাঞ্চল বলেই মনে হয়। আবর্জনা শহরের অন্যতম সমস্যা হয়ে রয়েছে।

এর মধ্যেই ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার নামে কমিশন, প্রকল্পের ঘর দেওয়ার নামে উপভোক্তাদের কাছ থেকে কাটমানি, সরকারি সুবিধা পাইয়ে দিতে স্বজনপোষণের অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়ে তৃণমূলের অন্দরমহলেও ক্ষোভের অন্ত নেই। দিদিকে বলো কর্মসূচিতে গোষ্ঠী কাজিয়া দফায় দফায় প্রকাশ্যে এসেছে। বিদায়ি চেয়ারম্যান সুভাষবাবুর বিরুদ্ধে বাকিদের এড়িয়ে ডিক্টেটরশিপ চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে এখন ডালখোলায় তৃণমূলে ফাটলও ধরেছে। সুভাষবাবু ফের নিজেকেই চেয়ারম্যানের দাবিদার বলে ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে, বিরোধী লবি সুভাষবাবুকে কোণঠাসা করতে উঠেপড়ে লেগেছে।

তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরেও কাউন্সিলারদের বড়ো অংশ সুভাষবাবুর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিল। পরে দলের শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। পুরভোটে কাটমানি ইশ্যুও বড়ো ফ্যাক্টর হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। শুধুমাত্র হাউজিং ফর অল প্রকল্পেই ঘর প্রতি ১২ শতাংশ হারে কাটমানির গুঞ্জন রয়েছে। তাতে ৮০০ ঘরের হিসেবে সেই কাটমানির পরিমাণ সাড়ে ৩ কোটি টাকার উপর দাঁড়ায়। একইভাবে অন্য উন্নয়নের কাজেও ১০ পারসেন্ট কমিশনের গুঞ্জন রয়েছে। দিদিকে বলো কর্মসূচিতে এই অভিযোগগুলি বারবার উঠে এসেছে। তৃণমূলের এক নেতার কথায়, কাটমানি এবং কমিশনের হিসেব কষতে বসলে ক্যালকুলেটরেও কুলোবে না।

তৃণমূলের ডালখোলা টাউন সভাপতি তনয়বাবু বলেন, কংগ্রেস পুরবোর্ড তৃণমূলে যোগ দিয়েছিল। ফলে দিদির স্বচ্ছতা এবং উন্নয়ন নিয়ে তারা ওয়াকিবহাল ছিল না। সেই কারণেই একাধিক অনিয়ম হয়েছে বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তা অস্বীকার করা যাবে না। কমিশন বা কাটমানির অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে তাও অস্বীকার করা যাবে না। তিনি বলেন, আমরা এখন থেকেই সাধারণ মানুষের কাছে দিদির আদর্শ নিয়ে স্বচ্ছ পুরবোর্ড গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে যেতে শুরু করেছি। মানুষকে বোঝানো হচ্ছে, যা হয়ে গিয়েছে তা অতীত। ক্ষমতায় এলে স্বচ্ছ পুরবোর্ড গঠন করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তৃণমূলই পুরবোর্ড গড়বে।

বিদায়ি চেয়ারম্যান সুভাষবাবু বলেন, কাটমানি ও কমিশনের অভিযোগ পরিকল্পিতভাবে পুরবোর্ডকে বদনাম এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ছড়ানো হয়েছে। মানুষের এই বিভ্রান্তি দূর করতে আমরা মানুষের মধ্যে যাচ্ছি। তাঁর দাবি, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। মানুষ আমাদের কথা বুঝতে পারছে। গোষ্ঠী কাজিয়া নিয়ে সমস্যা ছিল। বর্তমানে সেগুলি অনেকাংশেই দূর করা গিয়েছে। আপনাকেই কি চেয়ারম্যান হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে সুভাষবাবু বলেন, বিরোধীদের কোনো নেতা নেই। দীর্ঘ বছর আমি এই দায়িত্ব সামলেছি। তবে দলই এই বিষয়ে শেষকথা বলবে।