বাম ও ঝাড়খণ্ড মোর্চার ব্যর্থতায় চা বলয়ে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি

158

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা : আলিপুরদুয়ার জেলার চা বলয়ে গত ১০ বছরে তরতর করে বেড়েছে বিজেপির সংগঠন। এমনকি ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রটি বিজেপির দখলে গিয়েছে। সেবার বিরাট ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন বিজেপি প্রার্থী জন বারলা। বিশেষ করে মাদারিহাট, কালচিনি, কুমারগ্রামের মতো চা বাগান অধ্যুষিত এলাকাগুলি বিজেপিকে অক্সিজেন জুগিয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, চা বলয়ে আদিবাসী ভোটব্যাংকে থাবা বসাতে সক্ষম হতেই হুহু করে বাড়তে থাকে বিজেপির ভোটব্যাংক। বিশেষ করে ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা নামের আদিবাসী সংগঠনটির ভোট কমতেই ফুলেফেঁপে ওঠে বিজেপির সংগঠন। অথচ সরকারে থাকা সত্ত্বেও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওই ভোটব্যাংক নিজেদের বাক্সে টানতে পারেনি শাসকদল তৃণমূল। ফলে ২০১৯ সালে তৃণমূলকে হারাতে হয় আলিপুরদুয়ার লোকসভা আসনটি। পরিসংখ্যান বলছে, বামেদের পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার ভোট কমতেই ফুলেফেঁপে উঠেছে বিজেপি।

একসময় গোটা আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রটি বামফ্রন্টের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। ওই লোকসভা কেন্দ্রে বরাবরই বামফ্রন্টের আরএসপির সংগঠন বেশি সক্রিয় ছিল। তাই আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রটিতে বামফ্রন্টের প্রার্থী মনোনীত হতেন আরএসপি থেকে। কিন্তু বাম জমানার শেষলগ্নে চা বলয়ে মাথা তোলে আদিবাসী সংগঠনগুলি। অধুনা আলিপুরদুয়ার জেলা তথা তৎকালীন আলিপুরদুয়ার মহকুমার মাদারিহাট, কালচিনি ও কুমারগ্রাম ব্লকগুলি চা বাগান অধ্যুষিত। কুমারগ্রামে ১২টি, কালচিনিতে ১৯টি, মাদারিহাট বীরপাড়া ব্লকে ১৯টি এবং গোটা মাদারিহাট বিধানসভা কেন্দ্রে ২৪টি চা বাগান রয়েছে। ২০১১ সালে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার প্রার্থীরা ওই বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রচুর ভোট পান। ২০১১ সালে কুমারগ্রামে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার বিনয়কুমার মিঞ্জ প্রায় ১১ শতাংশ, কালচিনিতে সন্দীপ এক্কা ২৩ শতাংশের বেশি এবং মাদারিহাটে জেরোম লাকড়া প্রায় ১৭ শতাংশ ভোট পান। কিন্তু ২০১৬ সালে কুমারগ্রামে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার প্রার্থী ভোট পান মাত্র দেড় শতাংশের কিছু বেশি। কালচিনিতে সেবার ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার প্রার্থী প্রায় ১.৪৪ শতাংশ এবং মাদারিহাটে মাত্র ২ শতাংশ ভোট পান। এদিকে, ২০১১ সালে বামফ্রন্ট কুমারগ্রামে প্রায় ৪১ শতাংশ, কালচিনিতে ২৫ শতাংশের বেশি, মাদারিহাটে ৩২ শতাংশ ভোট পায়। কিন্তু ২০১৬ সালে কুমারগ্রামে বাম প্রার্থীর ভোট কমে ৩৪ শতাংশ, কালচিনিতে ৭ শতাংশেরও কম এবং মাদারিহাটে ২০ শতাংশের কম হয়ে দাঁড়ায়।

- Advertisement -

এদিকে, ওই তিনটি চা বলয় অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্রে একদিকে যেমন বামফ্রন্ট ও ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার ভোট কমেছে, তেমনই বেড়েছে বিজেপির ভোট। প্রসঙ্গত, চা বাগানে ২০১১ সালে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার প্রার্থী আদিবাসীদের একটা বড় অংশের ভোট পেলেও তখনও বামফ্রন্টের ঝান্ডা বয়ে চলছিলেন চা বাগানের আদিবাসী শ্রমিকদের অনেকেই। কিন্তু ২০১৬ সালে বামফ্রন্ট ও ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার ভোটব্যাংকে ধস নামার পাশাপাশি বাড়তে থাকে বিজেপির ভোট। ২০১১ সালে কুমারগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হপনা কুজুর মাত্র ৭.১৩ শতাংশ, কালচিনির বিজেপি ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সমর্থিত নির্দল প্রার্থী উইলসন চম্প্রমারি ৩০ শতাংশ ও মাদারিহাটের বিজেপির প্রার্থী মনোজ টিগ্গা ২৬ শতাংশ ভোট পান। কিন্তু ২০১৬ সালে কুমারগ্রামের বিজেপি প্রার্থী লিয়স কুজুর ২১.৬৬ শতাংশ, কালচিনির বিশাল লামা ৩৪.১৪ শতাংশ এবং মাদারিহাটে মনোজ টিগ্গা ৪৫ শতাংশ ভোট পান। অর্থাত্, আদিবাসী বলয়ে বামেদের ভোটের পাশাপাশি আদিবাসী সংগঠনের ভোটব্যাংকেও ধস নামাতে সক্ষম হয় বিজেপি।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারই ফসল তোলে বিজেপি। কিন্তু সরকারের তখতে থাকা সত্ত্বেও ওই তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রের চা বলয়ে সংগঠন তেমনভাবে বাড়াতে পারেনি তৃণমূল। ২০১৬ সালে কুমারগ্রামে জয়ী হন তৃণমূলের প্রার্থী জেমস কুজুর। কিন্তু ভোটের শতাংশ ৪০.৮১ থেকে কমে হয় মাত্র ৩৭.২৭ শতাংশ। অথচ, ওই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী পরাজিত হলেও ৭.১৩ শতাংশ থেকে ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ২১.৬৬ শতাংশ। মাদারিহাটে ২০১১ সালে তৃণমূল সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী অতুল সুব্বা ১৯.৫৪ শতাংশ ভোট পান। ২০১৬ সালে তৃণমূলের পদম লামা পান ২৯.৫১ শতাংশ ভোট। সেখানে বিজেপির মনোজ টিগ্গার ভোট ২৫.৯৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয় ৪৩.৯৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে কালচিনিতে তৃণমূলের প্রার্থী উইলসন চম্প্রমারি জেতেন মাত্র ১৫১১ ভোটে।