উত্তরবঙ্গে সুপারি পাচারের ঘাঁটি ফালাকাটা

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : চকোলেট, সিএট, টপফালি, ক্যান্ডি! না, এগুলি কোনও নামী সংস্থার সামগ্রী নয়। সবটাই সুপারি পাচার কারবারের কোড নাম। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, মায়ানমার ও নেপাল থেকে চোরাপথে আসা সুপারিতে ভরে গিয়েছে উত্তরবঙ্গের বাজার। লকডাউনে মাদকের পাশাপাশি চোরাপথে ঢুকছে সুপারিও। উত্তরবঙ্গ হয়ে সেই সুপারি পৌঁছে যাচ্ছে কলকাতা, দিল্লিতেও। পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় সুপারির সঙ্গে বিশেষ পার্থক্য না থাকায় চোরা সুপারি আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে না। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন চোরাকারবারিরা।

এক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা কর্তা বলেন, ঘরে ঘরে বা দোকানে যে সুপারি আমরা খাই তার বেশিরভাগটাই মায়ানমার ও নেপালের। এর থেকেই বুঝে নিতে হবে কতটা প্রভাব চোরাকারবারের। এসএসবির শিলিগুড়ি ফ্রন্টিয়ারের আইজি শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিভিন্ন সময় আমরা বহু সুপারি আটক করেছি। নেপাল ও ভুটান দুই সীমান্তেই নজরদারি চলছে। চোরাকারবার রুখতে নিয়মিত অভিযানও করা হচ্ছে। গোয়েন্দাদের সন্দেহ, মূলত তিনটি রুট ধরে রাজ্যে ঢুকছে মায়ানমার ও নেপালের সুপারি। অসম হয়ে তুফানগঞ্জ ও আলিপুরদুয়ারের মধ্য দিয়ে সুপারি পৌঁছাচ্ছে ফালাকাটার একাধিক ঘাঁটিতে। সেখান থেকে চাহিদা অনুসারে পৌঁছে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বাজারে। অসম হয়ে সরাসরিও সুপারি যাচ্ছে কলকাতা ও দিল্লিতে। ফালাকাটাই উত্তরবঙ্গের সুপারি পাচারের সবথেকে বড় ঘাঁটি।

- Advertisement -

পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, একবার ব্যবসায়ীর গুদামে সুপারি ঢুকে গেলে সেগুলি চোরাপথে এসেছে সেটা প্রমাণ করা খুবই কঠিন। কারণ কারবারের সঙ্গে এমন কিছু ব্যবসায়ী যুক্ত রয়েছেন, যাঁদের ব্যবসার বৈধ কাগজপত্র আছে। ওই ব্যবসায়ীরা বিক্রি ও কেনার রসিদ দিয়ে চোরা সুপারিকে বৈধ প্রক্রিয়াতে খুল্লামখুল্লা বিক্রি করছে। সূত্রের খবর, ভারত-নেপাল সীমান্তের পানিট্যাঙ্কি, খড়িবাড়ির বিভিন্ন এলাকা দিয়ে নেপাল থেকে সুপারি ঢুকছে রাজ্যে। এসএসবির আধিকারিকদের বক্তব্য, খোলা সীমান্তের সুযোগ নিয়ে ছোট ছোট বস্তা, থলে করে নেপাল থেকে সুপারি এনে সেগুলি বাস, ছোট ট্রাকে তুলে শিলিগুড়ি শহরে আনা হচ্ছে। খড়িবাড়ি, বাগডোগরা হয়ে শিলিগুড়ি টাউন স্টেশনের উপর দিয়ে যেসব ট্রেন চলাচল করে সেই ট্রেনগুলিতেও নেপালের চোরা সুপারি আনা হয় শিলিগুড়িতে। লকডাউন চলতে থাকায় ট্রেন বন্ধ। তাই সুপারি আনার জন্য প্যাডলারের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে। এখন তাঁরা সাইকেল এবং মোটর সাইকেলে সুপারি পৌঁছে দিচ্ছে শিলিগুড়িতে।

ভুটান হয়ে সুপারি উত্তরবঙ্গে ঢুকছে বলেও জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। চামুর্চি ও ফুন্টশোলিং হয়ে চোরাপথে ভুটান থেকে সুপারি এসে জমা হচ্ছে তোর্ষা নদী লাগোয়া জয়গাঁর দুটি বস্তি এলাকায়। সেখান থেকে সেগুলি চলে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বাজারে। মূলত শুকনো সুপারিই চোরাপথে রাজ্যে ঢুকছে। মান অনুসারে সুপারির দামেরও তফাত রয়েছে। এসএসবি সূত্রে জানা গিয়েছে, চোরাকারবারে ক্যান্ডির দাম ও চাহিদা সবথেকে বেশি। বর্তমানে প্রতি কিলো ক্যান্ডি গড়ে ৪০০-৪২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তারপরই রয়েছে টপফালি। তা প্রতি কিলো বিক্রি হচ্ছে গড়ে ২৫০-২৭০ টাকা দরে। প্রতি ক্যাটিগোরির সুপারিই খোলা বাজারে কিলো প্রতি প্রায় ১৫০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হয়।

অসম পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মূলত দুটি হাইওয়ে ধরে মায়ানমারের সুপারি অসমে ঢুকছে। আর সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে অন্য রাজ্যে যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি রাস্তা মিজোরাম থেকে শুরু হয়ে শিলচর, শিলং, গুয়াহাটির মধ্য দিয়ে গিয়েছে। অন্য রাস্তাটি মণিপুরের মোরে থেকে শুরু হয়ে ইন্দো-মায়ানমার সীমান্ত বরাবর চলে গিয়েছে। দুটি রাস্তাই ধুবড়ি ও কোকরাঝাড়ের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত আছে। রাজ্য পুলিশের উত্তরবঙ্গের আইজি বিশাল গর্গ বলেন, আমরা বিষয়টির উপর নজর রাখছি। পাচার রোধে জেলায় জেলায় পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।