চেনা-অচেনা সংসদ: চিন্তামগ্ন চন্দ্রগুপ্ত!

[ভারতের সংসদ ভবন এক ঐতিহাসিক স্থান। শুধু রাজনৈতিক উত্থান-পতনই নয়, বহু অশ্রুত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ব্রিটিশ স্থপতি স্যার এডউইন ল্যুটিয়েন ও হার্বার্ট বেকারের প্রায় শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই এই কীর্তি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের মন্দির’রূপে যা পরিচিত। আজও দেশ জুড়ে এই স্থান ও তাঁর স্থান-মাহাত্ম্য নিয়ে চর্চায় বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি। সংসদে কি হয়, সংসদে কি আছে, তার কর্মকাণ্ড তথা ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাঘুরির নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা অজানা কাহিনি বা মিথ নিয়ে আজও কিন্তু সাধারণ মানুষের কৌতুহল ও বিস্ময়ের শেষ নেই। উত্তরবঙ্গের পাঠকদের জন্য রইলো সেই পার্লামেন্ট নিয়ে কিছু অজানা গল্প, যা আগে কখনো বলা হয়নি]

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের (আইপিসি) প্রণেতা থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকাউলে বা লর্ড ম্যাকাউলের (১৮০০-১৮৫৯) ছোটবেলার একটা গল্প বাবার কাছে স্কুলে থাকতেই শুনে ছিলাম। ভারি মজার সেই গল্প।

- Advertisement -

ইংল্যান্ডের লেইসেস্টারে যে স্কুলে ম্যাকাউলে পড়তেন, একদিন টিফিন ব্রেকের সময় স্কুলের হেড মাস্টার দেখলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। স্কুলের সমস্ত ছোটছোট বাচ্চারা যেখানে একদিকে খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখনই অন্যদিকে ছোট্ট থমাস ব্যাবিংটন একটা ফোয়ারার ধারে বসে গালে হাত দিয়ে তন্ময় হয়ে কি যেন ভাবছে। কৌতুহলি হেডমাস্টার তার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন – ‘বলি, কি এত ভাবছ হে ছোঁড়া! তোমার বন্ধুরা কত খেলাধুলা করছে, তুমি কেন খেলছ না? কি এত ভাবনা তোমার?’ ছোট্ট থমাস ফোয়ারার জল পড়া থেকে চোখ না সরিয়ে গম্ভীর গলায় বলেছিল – ‘আই এম থিংকিং বাউট দ্য ম্যান এণ্ড দ্য ম্যানকাইণ্ড!’ ছোট্ট থমাসের মুখে সেই কথা শুনে জাঁদরেল হেডমাস্টারের মুখ যে কতটা হাঁ হয়ে গিয়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়।

পার্লামেন্টের করিডরে দৌড়াদৌড়ি করার সময় বহুবার এই চিন্তামগ্ন মানুষটির মূর্তি চোখে পড়েছে। যতবার দেখেছি ততবার মনে হয়েছে এত থমাস সাহেবের ছোট সংস্করণ! সময়ের অভাবে কখনো সামনে দাঁড়িয়ে দেখা হয়নি। তবু প্রথম প্রথম দূর থেকেই ভেবেছি কে এই ভদ্রলোক? এত কিসের ভাবনা? তাও আবার বাঁশী হাতে! এও মনে হয়েছে ‘বুক অফ স্যামুয়েলে’ (বাইবেল) পড়া ডেভিড – গলিয়াথের সেই মেষপালক ডেভিড নয়তো? তার হাতেও গুলতির পাশাপাশি থাকতো বাঁশী! কিন্তু সে ধারনাও ভুল প্রমানিত হয় যখন একদিন সময় বের করে এই চিন্তামগ্ন মনুষ্য-মূর্তিটির সামনে এসে দাঁড়ালাম আর আবিস্কার করলাম…

ইনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, বালক বয়সে, আগামীর ভারত নির্মাণের কল্পনায় মগ্ন! এমনটাই খোদিত আছে।

সেই চন্দ্রগুপ্ত, যিনি ভারতে মৌর্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। যিনি আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪০ অব্দে জন্মগ্রহণ করেন, কিংবদন্তি অনুসারে তিনি ক্ষত্রিয় নন্দবংশজ, মা মুরার সন্তান যিনি ছিলেন শূদ্রজা, অদ্ভুত তার সেই জীবন…রাখাল বালক থেকে রাজার পথ অতিক্রম করেছেন যিনি…পেয়েছেন তক্ষশিলার মহাপণ্ডিত কৌটিল্য বা চানক্যের সংস্পর্শ ও পরবর্তী কালে এই জুটির হাত ধরেই পতন হয় নন্দবংশের স্বেচ্ছাচারী শাসক ধননন্দের।  ইতিহাস গড়ার পথে শুরু হয় মৌর্য সাম্রাজ্যের পথচলা। শেষ জীবনে পুত্র বিন্দুসারের হাতে বিরাট রাজপাট তুলে দিয়ে জৈন ধর্ম অবলম্বন করে শ্রবণবেলগোলায় উপবাসের মাধ্যমে দেহত্যাগ করেন প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের এই ব্যাক্তিত্ব।

অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি মূর্তিটির দিকে। তিনি সেই সময় থেকেই আগামীর ভারতনির্মাণের স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন। অদ্ভুত লাগে। কোথাও যেন মিলেমিশে এক ও একাত্ম হয়ে ওঠেন ডেভিড, চন্দ্রগুপ্ত, লর্ড ম্যাকাউলেরা। অসম্ভব সুন্দর সেই স্বপ্নগুলির বপণ কবেই শুরু হয়েছিল এই অসামান্য মানুষগুলির চিন্তায়, সৃজনে, মননে। আপোষহীন ভাবে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি অদ্ভুত সুন্দর এই মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি ও লেখিকা হিল্ডা স্যালিগমান। পঞ্চাশের দশকে এই মূর্তিটি তিনি দান করেছিলেন ভারতীয় সংসদকে। আজও সংসদের গেট নম্বর ৫’র উল্টো দিকে সেই কীর্তি স্বমহিমায় বিরাজিত।

জানিয়ে রাখা ভাল, এই মুহুর্তে পার্লামেন্টে আবক্ষ ও পূর্ণাবয়ব মিলিয়ে রয়েছে মোট ১৬টি মূর্তি। এর মধ্যে বঙ্গ প্রতিনিধি মাত্র দুজন-ঋষি শ্রীঅরবিন্দ ও সুভাষচন্দ্র বসু। সেন্ট্রাল হলে প্রতিকৃতির সংখ্যা ২৪, বঙ্গ প্রতিনিধি মাত্র চার-দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষচন্দ্র, শ্যামপ্রসাদ মুখার্জি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রাজ্যসভা এবং লোকসভার গ্যালারি, আর্কাইভ, করিডোর ও লবিতেও বেশ ঠাসাঠাসি অবস্থা। প্রতিটি ছবি, মূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অলিখিত ইতিহাস। কিন্তু কোথাও না কোথাও অন্য সবার থেকে আলাদা, ‘স্বতন্ত্র’ মৌর্য-সম্রাট। তিনি হাজার বছর আগে থেকেই ভারতের নবনির্মানের চিন্তা শুরু করেছিলেন। আমরা আজও সেই মহান ঐতিহ্য বহন করে চলেছি…নিজের মত করে…নতুন শতাব্দীর দিকে…

পার্লামেন্টে আসুন! সময় করে একবার স্বাক্ষাত করে যান এনাদের সঙ্গে। সংসদে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে ঠিকই, কিন্তু এদের কথা কেউ মনেও করে না…তাকিয়ে দেখারও প্রয়োজন বোধ করে না কেউ৷ একদিন যারা ভারতের আকাশে নতুন সেই ভোরের স্বপ্ন দেখার স্পর্ধা রেখেছিলেন, আধুনিক ভারত কতটাই বা মনে রেখেছে তাদের? কতটাই বা দিয়েছে যথাযথ শ্রদ্ধা? আর কতটাই বা অনুসরন করেছে তাদের রচিত সেই ‘আলোর পথ’?

তাই আসুন, নতুন করে খুঁজে দেখতে শিখি! চিনতে শিখি, ভাবতে শিখি! ঋত্বিক ঘটক মশাই ত’ সেই কবেই বলে গেছেন – ‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো!’ সুতরাং…