ঠাকুর পঞ্চাননকে ঘিরে রাজনীতিতে ক্ষোভ পরিবারে

77

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, খলিসামারি : মাটির উঠোনে দাঁড়ালে ভেসে আসে তামাকের তীব্র গন্ধ। কয়ে বস্তা তামাক দাওয়ায় রাখা। দড়িতে জামাকাপড়ের সঙ্গে শুকোচ্ছে গোছা গোছা অসংখ্য রসুনের কোয়া। উঠোনেও রাখা সাদা রসুন। বাড়ির সামনে-পিছনে চাষ হয়, সেখান থেকে সদ্য তুলে আনা এসব।

রসুন-তামাকের মিলিত ঝাঁঝ সম্পূর্ণ আলাদা। এককথায় প্রকাশ করা কঠিন। শালকাঠ ও টিনের মূল বাড়িটার পাশে বসে বোমা ফাটালেন মনীষী রায়সাহেব ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার নাতি সমীর বর্মন। আমরা বেশ কয়েকদিন ধরে ভাবছি, এ বাড়িটা ভেঙে নতুন করে বানাব। নইলে এ বাড়ি টিকবে না। প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো ঘর। এখানেই জন্মেছিলেন আমাদের ঠাকুরদা।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গে ভোটের অন্যতম বড় অনুষঙ্গ ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা। ছোট-বড় নানা শহরের রাস্তায় এখন তাঁর ছোট-বড় মূর্তি দেখা যায় রাজবংশীদের নবজাগরণের প্রবক্তা হিসেবে। রাজবংশী ভোট টানতে নির্বাচনের বাজারে সব দলের বড়-মেজো-সেজো-ছোট নেতাদের মুখে আজ কার্যত স্লোগান জয় বাবা পঞ্চানন। পদ্মও যেমন, ঘাসফুলও তাই। নেতারা বোঝাতে তৎপর, কারা পঞ্চাননকে শ্রদ্ধা জানাতে বেশি আন্তরিক।

ঠিক একশো বছর আগে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনে পঞ্চানন জিতেছিলেন। সেটা ১৯২১। আর ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটের আগে খলিসামারিতে রায়সাহেব পঞ্চাননের জন্মভিটেয় বসে তাঁর নাতি সোজাসুজি বলে দিলেন, ওঁকে নিয়ে প্রচুর রাজনীতি হচ্ছে। খুব বাজে হচ্ছে এই ব্যাপারটা। একবার নয়, দুবার বললেন কথাটা।

মাথাভাঙ্গা থেকে শীতলকুচি যাওয়ার মাঝপথে ডানদিকে একটু ভিতরে এই খলিসামারি। সাবেক ছিটমহলের কিছু গ্রাম আরেকটু এগোলে। দিলীপ ঘোষ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, দুই প্রধান পার্টির দুই বড় নেতা কিংবদন্তি পঞ্চাননের ভিটেয় এসেছিলেন বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিশ্রুতির বহর নিয়ে পরিবারের জন্য ভালো পুনর্বাসনের প্যাকেজ নিয়ে। সমীর অবশ্য যা বলছেন, তাতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ে কবিতা হয়ে যায়- কেউ কথা রাখেনি। কিছুদিন আগে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি চিঠি দিয়েছেন নবান্নের ঠিকানায়, ডাকে। সেই চিঠি কি ওখানে পৌঁছাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এঁরা সব ঠাকুর পঞ্চাননের ভাইদের সম্পর্কিত নাতি। দুই ভাই বেকার, চাষবাস করেন। আরেক ভাই দুর্ঘটনার পর একেবারে শয্যাশায়ী। পঞ্চাননের নিজের নাতি রয়েছেন কোচবিহারে। অনেকটা আড়ালে থাকা যেন অভ্যাস তাঁর। ছবির মতো এই খলিসামারি গ্রামে বাইরের কিছু লোকজন আসেন মনীষী পঞ্চাননের জন্মদিন ও মৃত্যুদিনে। বাকি সময় নিস্তব্ধ থাকে। রাজবংশীদের শ্রেষ্ঠ পুরুষের পারিবারিক বাড়ি বেশ বড়ই। বাইরে থেকে দেখলে দারুণ অভিজাত দেখায়। সামনে বিশাল জমি। অজস্র গাছপালা। ভিতরে ঢুকলে বেরিয়ে আসে হতদরিদ্র ভাব। উঠোনের চারদিকে টিনের ছাদের চারটে ঘর।

ভিটে থেকে সামান্য দূরে পঞ্চানন বর্মার নামে বিশাল স্মৃতি মিউজিয়াম হয়েছে তিন বছর আগে। সেখানে এতদিনেও পাহারাদার বলে কিছু নেই। তালা লাগানো থাকে সবসময়। কেউ এসে দেখতে চাইলে, আরেক নাতির বাড়ি থেকে চাবি এনে তালা খুলে দেওয়া হয়। তখন জ্বালানো হয় লাইট। সেখানে ঢুকলে পৌঁছে যেতে হয় অন্যরকম বিস্ময়ে শেষ সীমানায়। এত বিশাল আধুনিক বাড়ি। অথচ পঞ্চাননের তিনটি পাঞ্জাবি, দুটি চিঠি, একটি থালা ও বাটি, কোষাকুষি ছাড়া কিছু দেখার নেই সেখানে। একটি ট্যাবে সম্ভবত রায়সাহেবের জীবনী দেখা যেত। সব স্তব্ধ এখন। পঞ্চানন সম্পর্কে একটা বোর্ডে বড়জোর লেখা পাঁচ-ছয় লাইন। তিন বছরের মধ্যে মিউজিয়ামের প্রধান গেটের কাঠ উইয়ে খেয়ে নিয়েছে।

কোচবিহার বা আলিপুরদুয়ারের গ্রামগুলোতে ঘুরলে অধিকাংশ জায়গায় এখন একটা কথা শুনতে পাচ্ছি খুব। দিদি খুব ভালো, কিন্তু জেলার ভাইগুলাই ওঁরে ডুবাইসে। মমতা সরকারের ভালো উদ্যোগের মান অধিকাংশ জায়গায় রাখতে পারেননি উত্তরের জেলা নেতারা। উলটে নানা অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে। উত্তরজুড়ে এত নতুন সেতু, এত ভালো রাস্তাঘাট হলে কী হবে? সরকারের সব প্রশংসনীয় উদ্যোগ একেবারে জলে গিয়েছে স্থানীয় নেতাদের লাগামহীন দুর্নীতিতে। স্থানীয়রা সব জানেন, কে কত টাকা পেলেন। এই দুর্নীতির সঙ্গে যোগ হয়েছে ঔদ্ধত্য।

মমতার হাতে খুব সম্প্রতি রাজ্যের এক নম্বর (জয়ী) ও সাত নম্বর (কামতেশ্বরী) দীর্ঘতম সেতু হয়েছে কোচবিহার জেলাতেই। ঠাকুর পঞ্চাননের নামে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যে কোচবিহারে বিশ্ববিদ্যালয় করেছেন মমতা। ভাষা আকাদেমির পাশাপাশি হয়েছে রাজবংশীদের জন্য নানা প্রকল্প। অনেক ক্ষেত্রে এসব লোক জানে না। যেমন এই মিউজিয়াম। যা দেখলাম, অহেতুক টাকার শ্রাদ্ধ হয়েছে সেখানে। পিছনে চলে গিয়েছে ভালো কাজের আন্তরিক উদ্যোগ।

ঠাকুর পঞ্চাননের পরিবারের সঙ্গে মাথাভাঙ্গার তৃণমূল প্রার্থী গিরীন্দ্রনাথ বর্মন ছাড়া কেউই যোগাযোগ রাখেন না এখন। উঠোনে তুলসীতলার পাশে রাখা পঞ্চানন বর্মার বাবার আমলের শিবলিঙ্গ। সেখানে এসে পুজো করে গিয়েছেন বিজেপি প্রার্থীও। কিন্তু তাঁরাও যে সেই গিয়েছেন আর ফেরেননি। গিরিনের কথাতেই বরং পঞ্চাননের জন্মভিটে ভাঙা থেকে বিরত থেকেছেন তাঁর পৌত্ররা। পঞ্চানন বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আন্দোলনের অন্যতম মুখ গিরিন চেয়েছিলেন ঠাকুর পঞ্চাননের নামে বিশ্ববিদ্যালয় হোক খলিসামারিতেই। সেটা কোচবিহারে হওয়ায় মাঝে তিনি সরে গিয়েছিলেন পার্টি থেকে। এখন ফের সক্রিয়।

খলিসামারিতে ঢুকে বাজারের ডানদিকে এগোলে দূর থেকে চোখে পড়বে প্রাসাদের মতো হলুদ বাড়ি। এখানেই তাঁর স্মৃতিমাখানো জমিটাও ঠাকুর পঞ্চাননের পরিবারের। দেখার পর প্রশ্ন উঠবে, এত করে কি লাভ হল কিছু? কেউ জানেন না, এর ভবিষ্যত্ কী।

প্রায় ১২৫ বছর আগে কলকাতায় গিয়ে মেন্টাল অ্যান্ড মরাল ফিলজফি নিয়ে প্রাইভেটে এমএ করেছিলেন পঞ্চানন বর্মা। বিষয় নির্বাচনই বুঝিয়ে দেয়, কতটা অন্যরকম ছিলেন তিনি। আইন পাশ করে রংপুর আদালতে প্র‌্যাকটিস করতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন, তাঁর ব্যবহৃত আইনি গাউন ব্যবহার করতে চাইছেন না উচ্চবর্গীয় আইনজীবী। চোখ খুলে যায়। তখনই বিপ্লবের ভাবনা।

বেঁচে থাকলে এখন তাঁর বয়স হত ১৫৫। কোচবিহারের সব শহর-মফসসল-গ্রামের ভোটবাজারে এখন জাতপাত নিয়ে এত অগ্নিগর্ভ চর্চা, ঠাকুর পঞ্চানন সেসব দেখলে স্বর্গেও বিচলিত হবেন।