সরকারি সাহায্য পায়নি মৃত শ্রমিকের পরিবার

গৌতম দাস, গাজোল : অধীর আগ্রহে বসেছিলেন বাড়ির সবাই। ছেলে ঘরে ফিরছে। যাওয়ার আগে বাবা-মা এবং স্ত্রীকে বলেছিলেন, কাজে গেলেও ইদের আগেই ফিরে আসবেন। কাজ করে যে টাকা সঞ্চয় হবে তা দিয়ে ইদের বাজার করবেন। বাড়ির সবার জন্য কেনা হবে জামাকাপড়। মাস তিনেকের দুধের শিশুটাও বাদ যাবে না। কিন্তু তেমনটা হয়নি। কথা রাখতে পারেননি গাজোলের বাবুপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ঠনঠনিয়াপাড়ার বছর আঠারোর জাহির হোসেন। বাড়ি বয়ে এসেছে দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর খবর। আর তাতেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে গিয়েছে বাড়ির পরিবেশ। একরত্তি সন্তানকে বুকে ধরে উদাসভাবে চেয়ে আছেন স্ত্রী। শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন বাবা-মা। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে লকডাউন তাঁদের জীবন থেকে সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। আগামীদিনে সংসার চলবে কীভাবে তা ভেবে পাচ্ছেন না তাঁরা। অন্যদিকে, চাকনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের জাজিলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রশিদ মিয়াঁ (৪৭)। একই অবস্থা তাঁর পরিবারেও। পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনিও। দুটি পরিবারই সরকারি সাহায্যের আশায় পথ চেয়ে বসে আছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও জায়গা থেকেই একটুও আশার আলো দেখতে পাননি তাঁরা।

বেশিদিন আগের কথা নয়। লকডাউনের দিন পনেরো আগে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন গাজোলের বিভিন্ন এলাকার বেশকিছু মানুষ। কিন্তু লকডাউন ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত কাজ। অল্পদিনের মধ্যে লকডাউন উঠে গিয়ে কাজ শুরু হবে, সেই আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা। কিন্তু দফায় দফায় লকডাউন বাড়তে থাকায় নাগপুরে থাকতে আর সাহস পাননি তাঁরা। হাতে যেটুকু পয়সাকড়ি ছিল, তা যখন প্রায় শেষের মুখে তখন বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেন বেশ কিছু শ্রমিক। গাজোলের আট জন এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের দুইজন শ্রমিক সেখান থেকে ২৫ এপ্রিল হেঁটেই রওনা দেন। একদিন হাঁটার পর একটি ছোট পিক-আপ ভ্যান তাঁদের কিছুদূর নিয়ে আসতে রাজি হয়। কিন্তু ছত্রিশগড়ের রায়পুরের কাছাকাছি এসে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ওই পিক-আপ ভ্যানটি। ঘটনাস্থলে মারা যান দুজন শ্রমিক। আহত হন ছয়জন। ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহগুলি নিয়ে যাওয়া হয় মুম্বইয়ে একটি হাসপাতালে। বাকি দুজন শ্রমিক ফোন করে বাড়িতে খবর দেন।

- Advertisement -

মৃত জাহির হোসেনের এক আত্মীয় সবিউর রহমান জানান, খবরটা পাওয়ার পর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল তাঁদের। কী করবেন কিছুই ভেবে উঠতে পারছিলেন না। তবে কোম্পানির মালিক এবং অ্যাম্বুল্যান্স চালক অনেক সহযোগিতা করেছেন। তাঁরাই ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করেন। আহতদের চিকিৎসাও সম্ভব হয়েছে। এরপর কোনওরকমে টাকা জোগাড় করে আহত এবং নিহতদের ফিরিয়ে আনা হয়। ৭৬ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে দুটি অ্যাম্বুল্যান্সে আহতদের এবং ৩৯ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে একটি অ্যাম্বুল্যান্সে মৃতদেহ দুটি নিয়ে আসা হয়। গত ৩০ এপ্রিল দেহগুলি গ্রামে এসে পৌঁছায়। দুটি পরিবারই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জাহির হোসেনের বিয়ে বেশিদিন হয়নি। তিন মাসের একটি শিশুসন্তান রয়েছে। এঁদের কোনও জমিজায়গা নেই, দিনমজুরি করে সংসার চলে। স্বামীর মৃত্যুতে ভাষা হারিয়েছে স্ত্রী। শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন বাবা-মা। রশিদ মিয়াঁর পরিবারও দিনমজুর। ঘটনার কথা জানিয়ে বাবুপুর গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান ও পঞ্চায়েত সমিতির কাছে সাহায্যের আবেদন করা হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাতে তাঁদের এই করুণ অবস্থার কথা পৌঁছায়, তার ব্যবস্থাও করা হয়। কিন্তু এতদিন পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত একটি টাকাও সাহায্য পায়নি পরিবারগুলি। দুই সরকারের কাছেই আবেদন করা হয়েছে যাতে সর্বস্বান্ত এই পরিবারগুলি কিছু আর্থিক সাহায্য পায়।

তবে ঘটনার কথা জানতে পেরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিটুর জেলা সম্পাদক দেবজ্যোতি সিনহা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অপরিকল্পিত লকডাউনের জেরে আজকে সারাদেশে শ্রমিকরা চরম দুরবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ন্যূনতম খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অভাবে শ্রমিকরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ হেঁটে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন। হাঁটতে হাঁটতে অনেকে রাস্তাতেই মারা যাচ্ছেন। কেউ বা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মারা যাচ্ছেন। ট্রেন বা বাসে করে এই শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনা বাদ দিয়ে দুই সরকারের তরজা চলছে। আর তার জেরে মরছে সাধারণ মানুষ। গাজোলের যে দুজন শ্রমিক মারা গেলেন এবং যাঁরা আহত হলেন তাঁদের দায় নেওয়া উচিত দুই সরকারেরই। সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে ন্যূনতম আর্থিক সাহায্য করা উচিত ছিল। কিন্তু কোনও সরকারই এখনও পর্যন্ত এক পয়সাও দেননি। তাহলে ত্রাণ তহবিলের নামে যে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে তা কীসের জন্য। সেই টাকা দিয়ে এই সমস্ত হতভাগ্য শ্রমিকদের পরিবারকে কেন সাহায্য করা হবে না, প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।