করোনা আতঙ্কে দিল্লি ফেরত যুবককে তাড়াল পরিবার

রেজাউল হক, পুরাতন মালদা : লকডাউনের মধ্যে নিজেকে আড়াল করে কখনও লরিতে, আবার কখনও মালগাড়িতে লুকিয়ে দিল্লি থেকে ফিরেছিলেন মালদায় এক পরিযায়ী শ্রমিক। কিন্তু কে জানত, করোনা আতঙ্কে শুধু পাড়া-প্রতিবেশীরা নয়, বাড়ির লোকও তাঁকে তাড়িয়ে দেবেন। লেখাপড়া না জানা ওই শ্রমিক রাতভর মালদা থানার চৌরঙ্গি মোড় এলাকায় ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে পলিথিন বিছিয়ে শুয়ে থাকেন। কিন্তু সেখানেও পথচলতি কিছু মানুষ ওই ব্যক্তিকে দেখে সন্দেহ প্রকাশ করে। খবর পেয়ে মালদা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছোয়। তারাই দিল্লি ফেরত ওই শ্রমিককে মালদা মেডিকেলে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

ভিনরাজ্য ফেরত ওই ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। তাঁর বাড়ি পুরাতন মালদা পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের খয়েরাতিপাড়ায়। পরিবারে স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই রয়েছেন। তাঁদের জন্যই তিনি কাজ করতে গিয়েছিলেন দিল্লিতে। তখনই শুরু করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক। তারপর লকডাউন। হাতে তেমন টাকাকড়িও নেই। কিন্তু বাড়ি ফিরতে হবে। যেভাবেই হোক, তিনি পুরাতন মালদায় ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর ঠাঁই হয়নি নিজের বাড়িতে। পাড়া-প্রতিবেশীদের একাংশ তো বটেই, বাড়ির লোকরাও তাঁকে তাড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ। এরপর আশ্রয় হয় জাতীয় সড়ক ঘেঁষা ফুটপাত।

- Advertisement -

স্থানীয় কিছু বাসিন্দা পুলিশকে জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন, দিল্লিতে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে বারবার লরি বদলে, কখনও আবার মালগাড়ির খালি কামরায় লুকিয়ে কোনওরকমে শিলিগুড়ি পৌঁছেছিলেন। সেখান থেকে ঠিক একই কৌশলে লরিতে করে পুরাতন মালদায় ফেরেন। কিন্তু বাড়ির লোক যে তাঁকে তাড়িয়ে দিবে, সেটা কখনও ভাবতে পারেননি। স্বেচ্ছায় কোয়ারান্টিন সেন্টারে যেতে রাজিও ছিলেন তিনি। কিন্তু পরিবারের লোকদের এমন ব্যবহারে অভিমান বুকে চেপে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, যাদের জন্যে হাড়ভাঙা খাটতে ভিনরাজ্যে কাজ করতে গেলাম, তারাই আজ আমায় তাড়িয়ে দিল। দিল্লিতে যা উপার্জন করতাম, তার সিংহভাগ বাড়িতে পাঠাতাম। মৃত্যুর ভয় প্রত্যেকেরই আছে। কিন্তু আমি তো সুস্থ। বাইরে থেকে এসেছি বলে আমাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো দরকার। কিন্তু আমি মূর্খ মানুষ। কোথায় এসব হয়, কিছুই জানি না। তাই বাড়ি ফিরেছিলাম। প্রথমে পাড়ার কিছু মানুষ, তারপর বাড়ির লোকও তাড়িয়ে দেয়। অবশেষে চৌরঙ্গি মোড় এলাকায় জাতীয় সড়কের ধারে পলিথিন বিছিয়ে শুয়েছিলাম। সেখানেও কিছু মানুষ দূর দূর করে তাড়ানোর চেষ্টা করে। পুলিশই আমাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। ওই ব্যক্তির আক্ষেপ, এই সংকটের সময়ে আপন যে পর হয়ে যায়, তা জানা ছিল না। হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।

মালদা থানার পুলিশ জানিয়েছে, খয়েরাতিপাড়া এলাকার কিছু মানুষ এবং ওই ব্যক্তির পরিবারের লোকজন করোনা আতঙ্কের জন্য এই কাজ করেছেন। এনিয়ে অযথা শোরগোল না করাই ভালো। তবে চৌরঙ্গি মোড় এলাকার কিছু মানুষের কাছ থেকে খবর পেয়ে দিল্লি ফেরত ওই পরিযায়ী শ্রমিককে মৌলপুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসার পর মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। আপাতত ওই ব্যক্তিকে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারান্টিনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।