আমুর মাছের চাষ করে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা

315

কৌস্তুভ দে সরকার : মাছের বাজারে গেলে যে মাছটিকে সহজেই চোখে পড়ে তার নাম সাইগ্রিনাস বা আমেরিকান রুই। একে আবার কমনকার্পও বলা হয়। ভারতবর্ষে মাছের উৎপাদনে এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রজাতির একটি স্ট্রেইন (প্রুশিয়ান স্ট্রেইন) ১৯৩৯ সালে এবং অপর একটি স্ট্রেইন (ব্যাঙ্কক স্ট্রেইন) ১৯৫৭ সালে ভারতের জলাশয়ে চাষের সূচনা করা হয়। আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এই মাছ চাষের সূচনা হয় ১৯৫৮ সালে। এর প্রধান কারণ, আমাদের দেশের আবহাওয়ায় খুব সহজেই বেঁচে থাকতে পারে এবং বড় হয়। ফলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। তবে উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ ব্লকের মৎস্য সম্প্রসারণ আধিকারিক হিমাদ্রি চন্দ্র জানিয়েছেন, এই প্রজাতির মাছ চাষের কিছু সমস্যাও আছে। যেমন সাইপ্রিনাস প্রায় ৬ মাস বয়সে প্রজননক্ষম হয়ে পড়ে এবং বছরে একাধিকবার প্রজনন করে। এর ফলে পুকুরে মাছের সংখ্যাধিক্য ঘটে এবং অন্যান্য প্রজাতির মাছের সঙ্গে খাদ্য ও বাসস্থানের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সংখ্যাধিক্যের ফলে এই সাইপ্রিনাসের চাহিদা যদিও দক্ষিণ ভারতে খুব বেশি, কিন্তু আমাদের রাজ্যে এর চাহিদা খুব ভালো নয়, এর কারণ, দেহের আকার অর্থাত্ ফোলা পেট এবং দেহে মাংসের পরিমাণ কম থাকা। তাই অনেক মাছচাষি এই মাছটিকে এড়িয়ে চলেন। বর্তমানে কমনকার্পের এক নতুন ধরনের চাষ করে উপরোক্ত সমস্যাকে এড়ানো সম্ভব হচ্ছে। এর নাম আমুর। বিজ্ঞানসম্মত নাম সাইপ্রিনাস কারপিও হেমাটোপটেরাস।

এটি বর্তমানে দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতেও চাষ হচ্ছে। এদের দৈহিক গঠন কিছুটা আলাদা। দেহ লম্বাটে, পেটের আকার ফোলা না হয়ে লম্বাটে হয়। দেহের মাংসের পরিমাণ অনেক বেশি। এদের বৃদ্ধির হার অনেক বেশি, যা আমেরিকান রুইয়ের থেকে ২৭ শতাংশ বেশি। এরা প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি কৃত্রিম পরিপূরক খাদ্য গ্রহণ করতে সক্ষম। এর ফলে এফসিআর কম। শরীরে ফ্যাটের পরিমাণ কম হয়। এদের বৃদ্ধি এবং বেঁচে থাকার হার অনেক বেশি।

- Advertisement -

বর্তমানে উত্তর দিনাজপুর জেলাতে এই আমুরের চাষ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমুরের চাষ এখন সহজলভ্য বলে জানিয়েছেন হিমাদ্রি চন্দ্র। তিনি জানান, এর কারণ, আমুরের প্রজনন পদ্ধতি একদম আমেরিকান রুইয়ের মতো। হিমাদ্রি চন্দ্র জানান, মাছচাষিরা করণদিঘির দিলীপ মৎস্য হ্যাচারি এবং হেমতাবাদ ব্লকের সমসপুরের সরকার মৎস্য হ্যাচারি থেকে আমুরের চারা সহজেই পেয়ে যাচ্ছেন। উত্তর দিনাজপুর জেলার করণদিঘি ব্লকের মাছচাষি প্রাণবন্ধু পাল একজন রাজ্যস্তরের পুরস্কার প্রাপ্ত মাছচাষি। তিনি বলেন, তিনি এই আমুরের চাষ করে যথেষ্ট লাভবান হয়েছেন। আমুর ইন্ডিয়ান মেজর কার্প (আইএমসি)-এর সঙ্গে চাষ করা যায়। হিমাদ্রি চন্দ্র বলেন, যেহেতু আমুর নীচের স্তরের খাদ্য খায় তাই রুই, কাতলা মাছের সঙ্গে আমুর চাষ করার সময় মৃগেল মাছ সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া যায় এবং মাছের ফলন ভালো হয়। দেখা গিয়েছে ৪০-৫০ গ্রাম ওজনের আমুর বিঘা প্রতি ১০০-১৫০ সংখ্যায় ছাড়লে ৯ থেকে ১২ মাস পরে ২ থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত ওজনের মাছ পাওয়া যায়। হিমাদ্রিবাবু আরও বলেন, সাধারণত পরিপূরক ডোবা খাবার প্রযোগের ফলে এই ওজনের মাছ পাওয়া যায়।

বাজারে এই মাছের চাহিদাও ভালো। এই জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী রাজ্য বিহারের পূর্নিয়া, বাইসি প্রভৃতি জায়গায় যেখানে গ্রাসকার্প এবং সাইপ্রিনাসের চাহিদা বেশি সেখানে আমুরের চাহিদাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।