রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : আশ্বিনের ঘোর বর্ষণে টইটম্বুর বিল। তা আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ- এই নিয়ে দ্বিধায় ভাটরার বাসিন্দারা। বিলের জলে হাজার হাজার একর চাষের জমি তলিয়ে গেলেও ওই জলেই মিলছে নানা ধরনের দেশিয়ালি মাছ। আর তাতেই জীবিকার রসদ খুঁজে নিয়েছেন এলাকার খেটে খাওয়া বহু মানুষ।

পুরাতন মালদার সাহাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের দক্ষিণ ভাটরা গ্রাম। গ্রাম লাগোয়া প্রায় চার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত শান্তিপুর বিল। অবশ্য বিলটি ভাটরা বিল নামে বেশি পরিচিত। ফি বছর বর্ষার জলে ভরে ওঠে বিল। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিলের চারপাশে ধানচাষ করেছিলেন এলাকার কৃষকরা। তবে আশ্বিন শেষের ঘোর বৃষ্টিতে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। জলে তলিয়ে যায় আশেপাশের বহু আবাদি জমি। জল না নামা পর্যন্ত জমিতে চাষ একরকম অসম্ভব। চাষের জমি তলিয়ে যাওয়ায় প্রমাদ গুনছিলেন এখানকার কৃষকরা। যদিও জমি কেড়ে নিলেও জাল ভরা মাছ দিয়ে সেই খামতি পূরণ করে দিয়েছে ভাটরা বিল। ভরা বিলে জাল ফেললেই উঠে আসছে রুই, কাতলা, মৃগেল, ট্যাংরা, পাবদা, চান্দার মতো জলের রূপোলি ফসল।

- Advertisement -

আর তা দিয়ে রোজগারের পথ খুঁজে পেয়েছেন এলাকার বহু মানুষ। এখন ভাটরা বিলে গেলেই নজরে পড়বে সারি সারি জেলে ডিঙি। সকাল থেকে খেয়া, টানা ও ফাঁস জাল নিয়ে বিলে ডিঙি ভাসান আস্তাব শেখ, রোহন শেখ, মাসুম আলম, প্রদীপ সরকারের মতো বাসিন্দারা। দলবেঁধে বা একক ভাবে মাছ ধরেন তাঁরা। জালে কখনও ধরা দেয় রুই, কাতলা, মৃগেল, মাগুর, পাবদা। আবার কখনও জালে ওঠে ট্যাংরা, চান্দা, বেলে বা পাঁকাল। কপাল ভালো থাকলে প্রমাণ সাইজের বোয়ালেরও দেখা মেলে বৈকি। তবে সবচেয়ে বেশি মেলে চান্দা মাছ। মশারি জাল দিয়ে বিল থেকে দৈনিক চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ কেজি চান্দা মাছ ধরা হয় বলে জানালেন জেলেরা। প্রতি কেজি মাছ বিক্রি হয় ১৩০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা দরে।

আস্তাব শেখ নামে ভাটরার এক কৃষক জানালেন, প্রায় দুহাজার একর চাষের জমি বিলের জলে তলিয়ে গিয়েছে। শীতের আগে কোনোমতেই চাষবাস সম্ভব নয়। এখন মাছ ধরে বিক্রি করি। দৈনিক চারশো থেকে পাঁচশো টাকা উপার্জন হয়। মাসুম আলম নামে এক কৃষকের প্রায় তিন বিঘা চাষের জমি এখন জলের তলায়। আপাতত মাছ ধরাতেই মন দিয়েছেন তিনি। জালে রুই, মৃগেল ধরা পড়ছে আকছার। বাজারে তাই বিকোচ্ছে আড়াইশো-তিনশো টাকা কেজি দরে। তিনি জানালেন, বিলের মাছের স্বাদ বেশি, তাই চাহিদাও বেশি থাকে। বহু পুকুর থেকে ভেসে আসা মাছ এখন বিলে আশ্রয় নিয়েছে। এই মাছ ধরে আনা মাত্রই বিক্রি হয়ে যায়। ভাটরা বিলের ধারে গেলে সকাল সন্ধে নজরে পড়বে মানুষের ভিড়। এদের মধ্যে অনেকেই আসেন টাটকা মাছ কিনতে।

রঞ্জন বালা নামে তেমনই একজন ক্রেতা জানালেন, গত কয়েদিন ধরে বাজারে মাছ নিচ্ছি না। শহর থেকে বাইক নিয়ে বিকেলে চলে আসি এখানে। অনেক কম দামে টাটকা মাছ নিয়ে যাই। মাছের টানেই এখন ভাটরা বিলে দিনভর ডিঙি ভাসান কৃষকেরা। জমি হারানোর দুঃখ ভুলতে এখন দাওয়াই যে সেটাই। জমি নয়, বিলই আমাদের জোগাচ্ছে পেটের ভাত।