১ বছরেও ফসলের ক্ষতিপূরণ মেলেনি, ঝিনুক-গেঁড়ির বিনিময়ে চাল

283

সুভাষ বর্মন, ফালাকাটা : জলদাপাড়া বনাঞ্চল লাগোয়া ফালাকাটার বংশীধরপুরের দুই পঞ্চায়েত এলাকায় খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। গতবছর ঝড়, শিলাবৃষ্টিতে ৮০০ একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রশাসন আশ্বাস দিলেও আজও তাঁরা ক্ষতিপূরণ পাননি বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ। এদিকে, একমাস ধরে লকডাউনের জেরে এলাকার কৃষি অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। কৃষকরা ফসলের দাম পাচ্ছেন না। দিনমজুররা কাজ হারিয়েছেন। এজন্য প্রায় ১৫০টি আদিবাসী পরিবার সব থেকে বেশি সমস্যায় পড়েছে। আদিবাসীরা নদীতে ঝিনুক, গেঁড়ি ধরে অন্য এলাকায় গিয়ে বাড়ি বাড়ি তা দিয়ে বিনিময়ে চাল সংগ্রহ করছেন। প্রায় ১০ হাজার মানুষ খাদ্যসংকটে পড়েছেন। খাদ্যসামগ্রী দিয়ে তাঁদের সাহায্য করা হচ্ছে বলে জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।

এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য সাবিত্রী বর্মন বলেন, কৃষকরা গতবছরের ফসলের ক্ষতিপূরণ পাননি। এখন উপার্জনের পথ বন্ধ। আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেকেই নদীতে ঝিনুক ও গেঁড়ি ধরে পেটের ভাত জোগাড় করছেন। আমরা যতটা পারছি খাদ্যসামগ্রী বণ্টন করছি। আলিপুরদুয়ার জেলা পরিষদের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ তৃণমূল কংগ্রেসের সন্তোষ বর্মন বলেন, জেলা পরিষদের পাশাপাশি দলীয়ভাবে বংশীধরপুরে চাল দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও দেওয়া হবে। ফসলের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি জেলা থেকে রাজ্যস্তরে পাঠানো হয়েছে।

- Advertisement -

ফালাকাটা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের বংশীধরপুরের ১২/২২৬ এবং ১২/২২৭ নম্বর বুথের গ্রাম দুটির অর্থনৈতিক ভিত কৃষিকাজের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। গতবছরের ৩১ মার্চ শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে বংশীধরপুর লন্ডভন্ড হয়ে যায়। গ্রামের অর্থকরী ফসল ভুট্টা ও জাংলা শস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লক্ষ লক্ষ টাকার ফসল নষ্ট হওয়ায় গ্রামের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। ক্ষতিপূরণের জন্য কৃষকরা সংগঠিত হয়ে বহু আন্দোলন করেন। তৃণমূল কংগ্রেসের দিদিকে বলো কর্মসূচিতে জনপ্রতিনিধিরা এলাকায় গেলে কৃষকরা ক্ষোভ জানান। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁরা এক টাকাও ক্ষতিপূরণ পাননি। সংশ্লিষ্ট এলাকার ৫০ শতাংশ মানুষের কৃষিজমি রয়েছে। বাকিরা দিনমজুর। কৃষকরা এবারও ধারদেনা করে ভুট্টা ও অন্যান্য সবজির চাষ করেছেন। কিন্তু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের জেরে এবারও এলাকার কৃষি অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। ফসলের দাম না মেলায় কৃষকরা জমিতে দিনমজুরদের কাজে নিচ্ছেন না। কোথাও কাজ না মেলায় দিনমজুরদের খাদ্যসংকট দিন-দিন বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে নদীর ঝিনুক ও গেঁড়িই ১৫০ পরিবারের প্রায় ৬০০ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদিবাসী পুরুষ ও মহিলারা চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরে সনজয় নদীতে গিয়ে ঝিনুক ও গেঁড়ি ধরে বাড়ি বাড়ি সেগুলি বিলি করে বিনিময়ে চাল সংগ্রহ করছেন।

নদীর ঝিনুক ও গেঁড়ি ধরেই এখন তাঁদের সংসার কোনওমতে চলছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা সুরাজ, রাতুয়া, রজনী, জিকনি, টুম্পা ওরাওঁরা জানান। তাঁরা র‌্যাশন থেকে পর্যাপ্ত চালও পাননি বলে জানিয়েছেন। ফালাকাটা কলেজের অধ্যাপক মেজবিলের অভিরঞ্জন বর্মন বলেন, কয়েকজন আদিবাসী মহিলা আমার বাড়িতে ঝিনুক ও গেঁড়ি দিয়ে বিনিময়ে চাল সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছেন। নেপালিপাড়ার কৃষক কেশব উপাধ্যায় বলেন, এখনও গতবছরের ক্ষতিপূরণ মেলেনি। এবার লকডাউনের জেরে সবজির দাম না থাকায় কৃষকদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তাই কৃষকরা জমিতে কাজের জন্য শ্রমিক নিতে পারছেন না। তৃণমূল কিষান ও খেতমজদুর কংগ্রেসের ফালাকাটা-২ অঞ্চল সভাপতি বংশীধরপুরের দীপক রায় বলেন, এখানকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ সমস্যায় পড়েছেন। সংগঠনগতভাবে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করা হচ্ছে।