রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : তপশিলি জাতি, উপজাতির শংসাপত্র না মেলায় শিলিগুড়ি মহকুমার বেশকিছু কৃষক পেনশন প্রকল্পের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন। শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ থেকে এবিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হলেও কোনো কাজ হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রের খবর, এতদিন তপশিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত কৃষকরা স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান, পঞ্চায়েরত সমিতির সভাপতির শংসাপত্র জমা করলেই কাজ হয়ে যেত। কিন্তু এবার নির্দিষ্ট করে মহকুমাশাসকের দেওয়া তপশিলি জাতি, উপজাতির শংসাপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

শিলিগুড়ির সহকৃষি অধিকর্তা পার্থ রায় বলেন, অল্প সময়ে মধ্যে কেউই এই শংসাপত্র জোগাড় করতে পারেননি। ফলে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সরকারি সিদ্ধান্ত তো মানতেই হবে। শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের সভাধিপতি তাপস সরকার বলেন, সরকারি নির্দেশে কিছুটা সরলীকরণ করে আগের মতোই পঞ্চায়েত প্রধান বা সভাপতিদের শংসাপত্রকেই মান্যতা দেওয়ার জন্য আমরা রাজ্যকে চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু রাজ্য তা খারিজ করেছে। ফলে শতাধিক বৃদ্ধ কৃষক, বর্গাদার সরকারি পেনশন প্রকল্পের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন। এবিষয়ে কৃষিমন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এদিন এক বিধায়ক খড়গপুরেও এমন সমস্যার কথা জানিয়েছেন। আমরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। প্রয়োজনে বিডিওদের একটা শংসাপত্র নিলেই তা গ্রাহ্য করা যায় কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কৃষি দপ্তর রাজ্যের প্রতিটি জেলাতেই ৬০ বছরের বেশি বয়সি গরিব চাষি, বর্গাদার এবং ভূমিহীন শ্রমিকদের বাছাই করে আমৃত্যু মাসে এক হাজার টাকা করে পেনশন দেয়। দপ্তর প্রতিটি জেলায় সংশ্লিষ্ট জেলাপরিষদের কৃষি স্থায়ী সমিতির সহযোগিতায় উপভোক্তাদের নামের তালিকা তৈরি করে রাজ্য সরকারের কাছে পাঠায়। সেইমতো রাজ্য সরকার কৃষক ও বর্গাদারদের নাম পেনশন প্রকল্পে নথিভুক্ত করে। শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ এলাকার জন্য চলতি বছরে কৃষি দপ্তরকে ১৬৪ জনের কোটা দেওয়া হয়। এর মধ্যে সিংহভাগই তপশিলি জাতি (এসসি) এবং উপজাতিভুক্ত (এসটি) কৃষক, বর্গাদার এবং ভূমিহীন শ্রমিক হতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়।

সেইমতো মহকুমা পরিষদের স্থায়ী সমিতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলতি বছরের এপ্রিল মাস নাগাদ এখানকার চারটি ব্লকের জন্য তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। ১৬৪ জনের মধ্যে মাটিগাড়া ব্লকে ছয়জন এসসি এবং দুইজন করে এসটি কৃষক, বর্গাদার ও ভূমিহীন শ্রমিক অর্থাৎ ২৪ জনের নাম তালিকাভুক্ত হয়। নকশালবাড়ি ব্লকে ১০ জন এসসি এবং তিনজন এসটি কৃষক, চারজন এসসি এবং দুজন এসটি বর্গাদার, ১৩ জন এসসি এবং তিনজন এসটি ভূমিহীন শ্রমিক অর্থাত্ ৩৫ জন, ফাঁসিদেওয়ায় ১৪ জন এসসি, তিনজন এসটি কৃষক, পাঁচজন এসসি, দুজন এসটি বর্গাদার, সাধারণ ছয়জন, ৩০ জন এসসি, পাঁচজন এসটি ভূমিহীন শ্রমিক অর্থাৎ ব্লক থেকে মোট ৬৫ জনের নাম নথিভুক্ত হয়।

এছাড়া খড়িবাড়ি ব্লকে ১১ জন এসসি, তিনজন এসটি কৃষক, চারজন সাধারণ, তিনজন এসসি এবং দুজন এসটি বর্গাদার, ১৪ জন এসসি এবং তিনজন এসটি ভূমিহীন কৃষক অর্থাত্ মোট ৪০ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। এই তালিকা কলকাতায় পাঠানোর পর সেখান থেকে জানানো হয় যে মহকুমাশাসকের দপ্তর থেকে পাওয়া তপশিলি জাতি, উপজাতির শংসাপত্র আবেদনপত্রের সঙ্গে পাঠাতে হবে। এই খবর চাউর হতেই প্রশাসনিকস্তরে হইচই পড়ে যায়। কেননা যে উপভোক্তাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তাঁদের কারও কাছেই মহকুমাশাসকের দপ্তর থেকে পাওয়া এসসি, এসটি শংসাপত্র নেই।

এর পরেই মহকুমা পরিষদের সভাধিপতি কৃষি দপ্তরের প্রধান সচিবকে চিঠি দেন। সেখানে তিনি লেখেন, এতদিন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের শংসাপত্র দিতেই কৃষকরা এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতেন। আচমকা নিয়ম বদল করায় গরিব মানুষের সমস্যা হবে। কেননা এখানে বহু কৃষকেরই এই শংসাপত্র নেই। এই বৃদ্ধ মানুষগুলি এখন এই শংসাপত্রের জন্য কোথায় কতদিন দৌড়াদৌড়ি করবেন? নিয়ম কিছুটা শিথিল করার দাবি জানান তিনি। কিন্ত তা মানেনি কৃষি দপ্তর। ফলে ১০ জন সাধারণ সম্প্রদায়ভুক্তের নাম পেনশন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হলেও বাকি ১৫৪ জনের নামই বাতিল হয়ে গিয়েছে।

এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ সভাধিপতি তাপস সরকার বলেন, বেনিফিসিয়ারিরা ৬০, ৭০, ৭৫ বছর বয়সি। তাঁরা এখন কীভাবে এসসি, এসটি শংসাপত্রের জন্য দৌড়াদৌড়ি করবেন? এই বয়সে এসে সেটা সম্ভব? আর শংসাপত্র না থাকায় এই গরিব মানুষগুলি সরকারি প্রকল্পের সুযোগ পাবেন না এটা হয় না। আমরা রাজ্যকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আবার চিঠি দেব।