পাকা ধানে শুয়োপোকার আক্রমণ, দিশেহারা চাঁচলের চাষিরা

98

মুরতুজ আলম, সামসী : কৃষিজমিতে আমন ধান পাকলেও পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে অনেকেই এখনো জমির ধান কাটতে পারেননি। এর মধ্যেই নতুন উপদ্রবে দিশেহারা চাঁচল মহকুমার একাধিক ব্লকের চাষিরা। চাঁচল মহকুমার অন্তর্গত ছয়টি ব্লকের ধানখেতেই হানা দিয়েছে শুয়োপোকার দল। উৎপন্ন ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে ওই কীটের দল। ফলে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন রতুয়া-১ ও ২, চাঁচল-১ ও ২ এবং হরিশ্চন্দ্রপুর-১ ও ২ ব্লকের কয়েকশো চাষি।

সমস্যা নিয়ে তাঁরা কৃষি দপ্তরের দ্বারস্থ হয়েছেন। অনেকেই দাবি জানিয়েছেন আর্থিক ক্ষতিপূরণের। পোকার হানাই উদ্বিগ্ন কৃষি দপ্তরও। এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে দ্রুত মাঠ থেকে ধান তুলে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি দপ্তরের কর্তারা। মহকুমা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবছর মহকুমার ছুটি ব্লকে ৬০ হাজার হেক্টর আমন ধানের চাষ হয়েছে। যার মধ্যে ৯০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গিয়েছে। ধান কাটার পর জমিতেই তা ফেলে রাখা হয়। জমিতেই ঝাড়াই মাড়াই করে ধান বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু এবার ধান কাটা শুরু হতেই প্রবল কুয়াশা থাকায় ধান শুকোচ্ছে না। পাশাপাশি শ্রমিকেরও অভাব রয়েছে। ফলে ধান মাঠেই পড়ে রয়েছে। কেটে রাখা গাছ থেকে ল্যাদাপোকা বা শুয়োপোকা ধানের শিষ কেটে ফেলছে।

হরিশ্চন্দ্রপুরের ধানচাষি নাজিম আক্তার, রতুয়ার চাষি মহম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, আবহাওয়া ভালো থাকায় অতিরিক্ত ফলন হয়েছে দেখে খুশিতেই ছিলাম। আমন ধান পাকার পর তা কেটে রেখেছি জমিতে। শুকানোর পর তা তুলে নিয়ে গিয়ে মাড়াই করতাম। কিন্তু শেষলগ্নে শিষকাটা ল্যাদা বা শুয়োপোকার হানায় মাথায় হাত পড়েছে। আমাদের মতো একই অবস্থা আরও অনেক চাষির। কীভাবে পোকার হানা থেকে রেহাই মিলবে তা জানতে অনেকেই কৃষি দপ্তরেরও দ্বারস্থ হচ্ছেন। চাঁদমুনির এক চাষি নুর হোসেন বলেন, মহাজনের কাছ থেকে ও ব্যাংক থেকে সুদে ঋণ নিয়ে ধান চাষ করেছিলাম। কিন্তু ধানে শুয়োপোকার আক্রমণ আমাদের চিন্তায় ফেলেছে। এখন ধানের যা ফলন তাতে খরচও উঠবে না। কৃষক সামিম আক্তার বলেন,  শুয়োপোকার আক্রমণে ধানের ফলন অনেক কম হচ্ছে। বিঘা প্রতি যেখানে ১৫ থেকে ২০ মন ধানের ফলন হওয়ার কথা থাকলেও পোকার আক্রমণে প্রতি বিঘাতে মাত্র পাঁচ থেকে সাত মন করে ধান পাওয়া যাচ্ছে। পোকার কারণে ফসল নষ্ট হওয়ায় কীভাবে সংসার চলবে, সেই চিন্তাতেই রাতের ঘুম উড়েছে।

হরিশ্চন্দ্রপুর মহেন্দ্রপুর গ্রামের ধানচাষি নিমাই দাস বলেন, আমি তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। কিন্তু দুই বিঘা জমির ফসল শুয়োপোকাতে নষ্ট করে দিয়েছে। ওই গ্রামেরই চাষি সামসুল হক বলেন, আমার দুই বিঘা জমির সব ফসল শুয়োপোকার আক্রমণে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এলাকায় ফসলে পোকার আক্রমণ হলে কৃষি দপ্তরের নজর রাখা উচিত ছিল। দপ্তরের বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিলে পোকার আক্রমণ থেকে অনেকটাই বাঁচা যেত। কিন্তু কৃষি দপ্তরের পক্ষ থেকে সেরকম কোনো নজরদারিই চালানো হয়নি। পর্যবেক্ষণের অভাবেই মহকুমার সমস্ত ব্লকে পোকার আক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

ধান কাঁচা অবস্থায় এমনটা ঘটলে তা দমন করা যেত। ক্ষতিগ্রস্ত ধানচাষিরা ক্ষতিপূরণের দাবিতে সরব হয়েছেন। মালদা জেলাপরিষদের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ এটিএম রফিকুল হোসেন বলেন, বিষয়টি আমার জানা রয়েছে। কৃষকরা যাতে সহজে কৃষিবিমার টাকা পেতে পারেন, সেই বিষয়ে আমি উদ্যোগী হব। এব্যাপারে হরিশ্চন্দ্রপুর-১ ব্লকের কৃষি উন্নয়ন কৃষি আধিকারিক ড. পলাশ সিদ্ধে বলেন, ধান পেকে যাওয়ার পর শুয়োপোকার আক্রমণ ঘটলে কৃষি দপ্তরের কিছুই করার থাকে না। তবে চাষিরা যাতে ক্ষতিপূরণ পান, সেই বিষয়টি দেখা হবে। চাঁচলের মহকুমা কৃষি আধিকারিক বিপদভঞ্জন পাল বলেন, শুয়োপোকার আক্রমণে যেসব ধানচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁরা ফসল বিমার জন্য সাদা কাগজে ব্লকের এডিএর কাছে আবেদন করতে পারেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে।