সংসার টেনেও মাধ্যমিকে স্কুল টপার ফারুক

সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর : ইচ্ছে থাকলে যে কোনও প্রতিকূলতাকেই দূর করা যায় ফের তার প্রমাণ মিলল। আর সেই প্রমাণ দিল হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের মিটনা হাইস্কুলের ছাত্র মোহাম্মদ উমর ফারুক। সংসারের জোয়াল নিজের কাঁধে নিয়ে এবার মাধ্যমিকে নজরকাড়া ফল করেছে সে। তার প্রাপ্ত মো নম্বর ৬০৮।

সংসারে একমাত্র রোজগেরে ফারুকের বাবা ছিলেন মিটনা হাইস্কুলের পার্শ্বশিক্ষক। কিন্তু বছর চারেক আগে তাঁর অকালমৃত্যুতে অথই জলে পড়ে যায় গোটা পরিবার। এদিকে মা সহ বাড়িতে ছোট আরও ২ ভাই। সেই সময় সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় ফারুক। শিক্ষক বাবার সন্তানকে হাতে তুলে নিতে হয় হাল-কোদাল। সংসার টানতে উমর ফারুক জমিতে হাল চাষ করা শুরু করে। সারাদিন জমিতে কাজ করার ফলে স্কুল যাওয়াও অনিয়মিত হয়ে পড়ছিল তার। অথচ জমিতে কাজ না করলে সংসারের চাকাও ঘুরবে না। তবু তারমধ্যেই মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি জন্য চলেছে কঠোর পরিশ্রম। আর এত কিছুর পরেও স্কুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে সে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

- Advertisement -

মালিওর গ্রাম পঞ্চায়েতের তিওরপাড়ার বাসিন্দা উমর ফারুক। তার মা মমতাজ মহল বলেন, ২০১৬ সালে আমার স্বামী মোঃ আলাউদ্দিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর চিকিৎসাতেই আমাদের জমানো সব টাকা খরচা হয়ে যায়। এখন পারিবারিক পেনশন হিসাবে আমরা ৩০০০ টাকা পাই। কিন্তু সেই টাকায় সংসার চলে না। তাই সংসার টানতে আমার বড় ছেলে ফারুক পড়াশোনার পাশাপাশি কাজে নেমে পড়েছে। সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ত। তার জন্য কখনও কখনও ওর স্কুল কামাইও করতে হয়েছে। তা বলে পড়াশোনায় কিন্তু কোনওদিনও খামতি দেয়নি ও। আমার আরও দুই ছেলে আসিফ রেজা ও মোস্তাফিজুর রহমানও মিটনা হাইস্কুলের ছাত্র। শিক্ষকরা সবসময় উমরকে সবরকমভাবে সাহায্য করেছেন। আমরা তাঁদের কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকব। তার পাশাপাশি ছেলের অক্লান্ত পরিশ্রমই আজ এই ফলের কারণ। আমি আশাবাদী আগামীতেও ছেলে ভালো ফল করবে।

ফারুকের স্কুলের সহ শিক্ষক আনন্দমোহন মণ্ডল জানান, ওর বাবা আমাদের স্কুলের পার্শ্বশিক্ষক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে ওরা বেশ বিপদে পড়ে যায়। তবু আমরা অর্থাৎ স্কুলের সমস্ত শিক্ষকরা মিলে ফারুককে যথাসাধ্য সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। তবে ছেলেটি নিজেও পড়াশোনায় খুব ভালো। এত কম বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ায় মাঝে মাঝে স্কুলে আসতে পারত না। তবে তার প্রভাব কোনওদিনই ওর পড়াশোনায় পড়েনি। আগামীতেও আমরা ওর পাশে থাকব। ওর এই সাফল্যে আমরা সকলেই খুব গর্বিত।

ফারুকের মামা আজিজুর রহমান বলেন, আমার ভাগ্নে ছোট থেকেই পড়াশোনায় খুব ভালো। তবে আমাদের এখন একটাই চিন্তা। অর্থ যেন ওর উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ফারুকের বক্তব্য, বাবা মারা যাওয়ার পর যদি সংসারের জন্য কিছু না করতাম তাহলে মায়ের পক্ষে একা সংসার চালানো খুব মুশকিল হয়ে পড়ত। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি জমিতে কাজ করতে হয়েছে শুধুমাত্র পয়সার জন্য। আগামীতে আমার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। চিকিৎসক হয়ে হরিশ্চন্দ্রপুরের পিছিয়ে পড়া এলাকার মানুষদের সেবা করার ইচ্ছা রয়েছে আমার।