বৈষ্ণবনগরের আসিফের অনুপ্রেরণা হয়তো বাবাই

319

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, মালদা : আত্মকেন্দ্রিক। এককথায় আসিফ মহম্মদকে এভাবেই দেখছেন মনোবিদরা। অত্যধিক আত্মকেন্দ্রিকতাই কি আসিফের মনকে জটিল আবর্তের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে? তার পরিণতিতেই কি বৈষ্ণবনগরের নৃশংস খুনের ঘটনা? এসবের প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারী অফিসাররা। ছিপছিপে চেহারার শ্যামবর্ণ ছেলেটার চাউনিতেই একটা অদ্ভূত দৃঢ়তা। মা, বাবা, বোন ও ঠাকুমাকে নৃশংসভাবে খুন করেও এতটুকু অনুতপ্ত নয়। বরং দাদাকে খুন করতে না পারায় আফসোস করে চলেছে প্রতি মুহূর্তে। লাগাতার জেরাতেও বিন্দুমাত্র ভাঙতে দেখা যায়নি আসিফকে।

কালিয়াচকের রাজনগর হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় আসিফ। কিন্তু তারপরই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে দেয়। স্কুলে হোক কিংবা পাড়ায়, কারও সঙ্গেই সে তেমন মেলামেশা করত না। সম্প্রতি তার মধ্যে আরও অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছিল। নিজে বাড়ির বাইরে বেরোনো তো দূরের কথা, বাইরের কেউ কোনও কাজে তাদের বাড়িতে গেলেও সবাইকে তাড়া করত আসিফ। ফলে গ্রামবাসীরা আসিফকে এড়িয়ে চলত। মাধ্যমিক পরীক্ষার পরই বাড়ি থেকে পালিয়েছিল আসিফ। বাইকে থেকে মাঝেমধ্যেই প্রচুর টাকা চেয়ে বাবাকে ফোন করত। আসিফকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিল তার পরিবার। কিন্তু বেশ কিছুদিন বাইরে থাকার পর একদিন হঠাতই সে বাড়ি ফিরে আসে। এই আসিফ ওরফে আন্নানই যে এতবড় হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে, তা ভাবতেও পারেননি গ্রামবাসীরা।

- Advertisement -

২৮ ফ্রেব্রুয়ারি, নিজেদের বাড়িতেই পরিবারের সকলকে নিকেশ করে দেওয়ার ছক কষে আসিফ। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় আসিফের দাদা আরিফ। মা,বাবা, বোন ও ঠাকুমাকে খুনের পর গোডাউনে পুঁতে দিয়ে প্রায় মাস চারেক গৃহবন্দি হয়ে থাকে আসিফ। দেহগুলি যাতে পুরোপুর নষ্ট হয়ে যায়, সেজন্য রাসায়নিক ভর্তি জারও জোগাড় করেছিল আসিফ। মাধ্যমিক পাস আসিফ কম্পিউটারে যথেষ্ট দক্ষ। নানা গ্যাজেট নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করত সে। বাড়িতে একাধিক সিসিটিভির ইন্সটলেশন নিজেই করেছিল। সিসিটিভিতে গোটা বাড়িতে নজরদারি চালাত আসিফ। ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে অবাধ বিচরণ ছিল বছর উনিশের এই যুবকের।

খুনের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রও মজুত করেছিল আসিফ। তবে সেগুলো দুই বন্ধুর বাড়িতে কৌশলে লুকিয়ে রাখে। খুনের পরিকল্পনা ও আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রাখার কৌশল দেখে পুলিশ নিশ্চিত যে আসিফ ঠান্ডা মাথার খুনি। কিন্তু আসিফ কি হঠাৎই অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে যায়? তার হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রই বা এল কোথা থেকে?

এই সব প্রশ্নের উত্তর উঠে এসেছে তার পারিবারিক ইতিহাস থেকে। আসিফের বাবা জাওয়াদ আলি এক সময়ে পুলিশের গাড়ি চালাত। কিন্তু পুলিশের গাড়ির চালক, এক সাদামাটা গ্রামবাসী রাতারাতি কীভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠল? অল্প কিছু দিনের মধ্যে একের পর এক লিচুবাগানের মালিকই বা কীভাবে হয়ে উঠল জাওয়াদ?

পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে বিস্ফোরক তথ্য। এক সময়ে জাওয়াদ মাফিয়াদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। অপরাধ জগতে জড়িয়ে অল্প সময়ে কোটিপতি হয়ে ওঠে। এমনকি জাওয়াদ আলির অস্ত্র কারবারিদের সঙ্গেও যোগ ছিল বলে অনুমান পুলিশের। সেই সূত্রেই আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজ এসেছিল আসিফের হাতে। মাফিয়াদের থেকে অস্ত্র কিনে তা আসিফকে তার বাবাই দিয়েছিল বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। জানা গিয়েছে, কালিয়াচকের কুখ্যাত দৃষ্কৃতী আনসারির দলের সদস্য ছিল জাওয়াদ। এলাকায় রুনু নামে তার পরিচিত তৈরি হয়। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আর অপরাধজগতের সঙ্গে জাওয়াদ ওরফে রুনুর যোগাযোগ আসিফকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে বলে পুলিশের একটি সূত্রে মনে করছে। বাড়ির বাইরে থাকাকালীন আসিফ কোনও গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে মাফিয়া যোগেই আসিফ বাবাকে ব্ল্যাকমেল করত বলে জানা গিয়েছে। আসিফের মুখ বন্ধ রাখতে চেয়েছিলেন জাওয়াদ। তাই আসিফের সব আবদার মেনে নিতেন। কিন্তু সেই আসিফই যে বাবাকে চিরকালের জন্য চুপ করিয়ে দেবে, তা বুঝতে পারেননি জাওয়াদ।