প্রকাশ মিশ্র, মানিকচক : সদ্যই মানিকচকের বিভিন্ন এলাকার অসংরক্ষিত অঞ্চলগুলি থেকে গঙ্গার জল কমতে শুরু করেছে। আর সেই সঙ্গে দুর্গত এলাকাগুলিতে দেখা দিয়েছে জ্বর, চর্মরোগ, ডায়ারিয়া সহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব। বিভিন্ন এই রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বুধবার প্রশাসনিক বৈঠক করল ব্লক প্রশাসন। তবে বন্যার জল কমতে শুরু করলেও বাঁধের ভেতরে সংরক্ষিত অঞ্চলে থাকা বৃষ্টির জল কমার কোনো লক্ষণ নেই। অন্যান্য বছর দীর্ঘ সময় ধরে জল বাড়তে থাকলেও দু-তিন দিনেই জল কমে যায়। কিন্তু এবারের প্রবণতা অন্য। এবার জল কমছে খুব ধীরগতিতে।

বাঁধের বাইরে বন্যার জল এবং বাঁধের ভিতরে বৃষ্টির জমা জল দুইয়ে উচ্চতাই প্রায় সমান থাকায় ভিতরের জল বাইরে বেরিয়ে যেতে পারছে না। ফলে বাঁধের ভিতর-বাইরে মিলিয়ে বহু পরিবার এখনো চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। এর ফলে বাড়ছে জ্বর, ডায়ারিয়া, চর্মরোগের প্রকোপ। মানিকচকের বিডিও সুরজিৎ পণ্ডিত বন্যা পরবর্তী সমস্যাগুলি মোকাবিলার জন্য বুধবার প্রধানদের এবং স্বাস্থ্যদপ্তরকে নিয়ে বৈঠক করেন। তাতে ব্লিচিং পাউডার ছড়ানো সহ মেডিকেল ক্যাম্প বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বন্যায় যেসব ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলির তালিকা তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে এদিন। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বন্যার জল ধীরগতিতে কমছে। তবু গঙ্গার জলস্তর বিপদসীমার মধ্যেই রয়েছে। ফুলহর এবং মহানন্দাতেও ক্রমাগত জল কমছে। ফুলহরে জল বিপদসীমার নীচে নামলেও মহানন্দার জল বিপদসীমার উপরে রয়েছে।

- Advertisement -

বর্তমানে বন্যা পরবর্তী রোগ-ব্যাধি দেখা দিচ্ছে বলে জানান জনপ্রতিনিধিরা। গোপালপুরের পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য রোজিনা বিবি জানান, বন্যার জল কমলেও সেই কমার হার খুব কম। তিনটি ত্রাণশিবিরে এখনো দুর্গতরা রয়েছেন। ইতিমধ্যে কয়েকজনের ডায়ারিয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার ব্লিচিং পাউডার। যেখানে জল নামছে সেই এলাকা দূষণমুক্ত করা প্রয়োজন। পানীয় জলের উৎস টিউবওয়েল এবং ইঁদারা ব্লিচিং পাউডার, হ্যালোজেন ট্যাবলেট দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা দরকার। বাঁধের ভিতরে এবং বাইরের বেশিরভাগ জমির ধানই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালং, টমেটো সহ বিভিন্ন সবজি নষ্ট হওয়ায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন কৃষকরা।

গোপালপুর অঞ্চলের প্রধান সীমা বিবি জানান, প্রচুর ফসল নষ্ট হয়েছে। কমা জলের ছোটো মাছ যাতে বানভাসিরা না খান, তার জন্য সচেতনতা দরকার। প্রতিবার বন্যার কমে যাওয়া জলের মাছ খেয়ে ডায়ারিয়ার প্রকোপ দেখা দেয়। এদিকে বাঁধের বাইরের জল ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও বাঁধের ভিতরে বৃষ্টিতে জমা জল নিকাশের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়েছে বহু পরিবারকে। একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন হীরানন্দপুরের প্রধান কাজল মণ্ডল, দক্ষিণ চণ্ডীপুর অঞ্চলের প্রধান অজয় মণ্ডলরা। তাঁদের কথায় বাঁধের বাইরের জমা জল নিয়ে সমস্যা ছিলই। এবার বাঁধের ভিতরের জমা জলও আমাদের ভাবাচ্ছে। তাঁরা দ্রুত স্বাস্থ্য শিবিরের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে ব্লিচিং পাউডার এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাড়ির দাবিও জানান তাঁরা। এদিনের সভায় ব্লিচিং পাউডার এবং মেডিকেল টিমের দাবি জানানো হয়েছে। মানিকচক অঞ্চলের সদস্য আশিস মণ্ডল জানান, এখন সবচেয়ে প্রথমে দরকার মেডিকেল টিম।

মানিকচকের বিডিও সুরজিৎ পণ্ডিত জানান, বুধবার ব্লক প্রাঙ্গণে মানিকচক ব্লকের সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান ও ব্লক স্বাস্থ্যদপ্তরকে নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে প্রধানদের জানানো হয়েছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া ঘরের তালিকা তৈরি করতে। সদস্যদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে থাকছেন একজন প্রধান, একজন পঞ্চায়ের সমিতির সভাপতির প্রতিনিধি, বিরোধী দলনেতা এবং একজন সরকারি প্রতিনিধি। এই কমিটি সরেজমিন তদন্তের পর তালিকা তৈরি করে ব্লক প্রশাসনের হাতে তুলে দেবে। প্রত্যেক অঞ্চলে মেডিকেল টিম তৈরি হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে কোথায় মেডিকেল ক্যাম্প করা হবে সেসব ঠিক করবে মেডিকেল টিম। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিকে দূষণমুক্ত করতে ব্লিচিং পাউডার, হ্যালোজেন ট্যাবলেট দেওয়া হবে।

বিডিও আরো জানান, ইতিমধ্যে প্রায় ২৪ হাজার ত্রিপল দুর্গতদের দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৮০ কুইন্টাল চিঁড়া, ২২ কুইন্টাল গুড়, জামাকাপড়, চাল দেওয়া হয়েছে। ফলে ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভ থাকার কথা নয়। ডায়ারিয়ার প্রকোপ সেভাবে হয়নি। জ্বর হচ্ছে। স্বাস্থ্যদপ্তর সেসব দেখছে। পানীয় জলের উৎসগুলি দূষণমুক্ত করার প্রক্রিয়াও শুরু হচ্ছে। ত্রাণ শিবিরে রান্না করা খাবার আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কবলিত গ্রামগুলিতে জল থাকায় ত্রাণ শিবিরগুলি এখনো আছে।

বিএমওএইচ হেমনারায়ণ ঝা জানিয়েছেন, আমরা দুর্গত এলাকায় গিয়ে নৌকায় করে প্রায় প্রতিদিনই মেডিকেল ক্যাম্প করেছি। ক্যাম্পের সংখ্যা এবার আরও বাড়ানো হবে। জ্বরের প্রাদুর্ভাব থাকলেও ডায়ারিয়ার কোনো রোগী মানিকচক হাসপাতালে এই মুহূর্তে চিকিৎসাধীন নেই। মালদা সেচদপ্তরের নির্বাহী বাস্তুকার প্রণবকুমার সামন্ত জানিয়েছেন, তিন নদীতেই আর জল বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং জল কমছে।