বিহার-বাংলা দ্বন্দ্বে বাড়িওলে সাতমাস বন্ধ খেয়া পারাপার

রণবীর দেব অধিকারী, ইটাহার : ঘাটে নৌকা বাঁধা। আজিজুল মাঝি পাড়ে বসে বিড়ি ফুঁকছেন। পারাপারের যাত্রী নেই। থাকবে কোথা থেকে? গত সাত মাস ধরে তো খেয়া পারাপার বন্ধ। ওপারে নৌকা ভিড়তে দিচ্ছে না বিহারের কিছু বজ্জাত লোক। এমনটাই অভিযোগ এপারের, বাংলার মানুষের। বারবার প্রশাসনকে জানিয়ে লাভ হয়নি। রাজনৈতিকস্তরে স্থানীয় বিধায়ক ওপারের বিধায়কের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগী হয়েছিলেন বটে। কিন্তু তাতেও ফল কিছু মেলেনি। বিহার-বাংলার এই দ্বন্দ্বে মাঝখান থেকে রুটিরুজির সংকটে পড়েছেন ইটাহার ব্লকের বাড়িওল গ্রামের কয়েকশো মানুষ। তাঁরা চাইছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিহারের প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে সমস্ত বিবাদ মিটিয়ে পুনরায় খেয়া পারাপার প্রক্রিয়া চালুর ব্যবস্থা করুক বাংলার প্রশাসন।

ইটাহার থানার বাড়িওল গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে নাগর নদী। গ্রামের লোক অবশ্য বলেন, এ নদীর নাম মহানন্দা। নদীর ওপারে বিহারের কাটিহার জেলার আবাদপুর থানার নলসর, ছঘরা, পাকাদলা, পোদলাপুকুর ও বাড়িওল গ্রাম। এপারে বাংলার ইটাহার থানার সুরুন-১ অঞ্চলের বাড়িওল, কোটার, বালিজোল, গোরাহার, বাজিতপুর ও ডামডোলিয়া গ্রাম। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজন ও জীবিকার টানে দুই পাড়ের মানুষই নির্ভরশীল পরস্পরের ওপরে। এপারের মানুষ যেমন ওপারে যান হাটবাজার ও ব্যবসার প্রয়োজনে, তেমনই ওপারের মানুষও এপারে আসেন ব্যবসা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ যাতায়াত করেন বাড়িওল খেয়াঘাট দিয়ে কিন্তু সাত-আট মাস আগে বিহারের কিছু মানুষ বিনা প্ররোচনায় গোলমাল পাকিয়ে খেয়া পারাপার বন্ধ করে দিয়েছে বলে এপারের মানুষের অভিযোগ।

- Advertisement -

এপারের বাড়িওলের বাসিন্দা গোলাম মর্তুজা বলেন, মাস আটেক আগে আমাদের এক সিভিক ভলান্টিয়ার ওপারে গিয়েছিলেন। তাঁকে বিনা অপরাধে আটকে রেখে ওপারের কিছু দুষ্কৃতী মারধর করে। এই নিয়ে দুই পারের মানুষের মধ্যে একটা গোলমালের সৃষ্টি হয়। তারপর থেকেই ওপারে আর নৌকা ভিড়তে দিচ্ছে না ওই দুষ্কৃতীরা। এর আগে নদীতে যখন বেশি জল ছিল না, তখন বাঁশের মাচা পুড়িয়ে দেয় ওই দুষ্কৃতীরা। আমরা বিষয়টি আমাদের পুলিশ-প্রশাসন ও বিধায়ককে জানিয়েছি। কিন্তু সমস্যা এখনও মেটেনি। তিনি বলেন, খেয়া পারাপার বন্ধ থাকায় রুটিরুজির সংকটে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এপারের বহু ফেরিওয়ালা ওপারে বেচাকেনা করতে যান। তাছাড়া অন্তত ৫০টি টোটো, অটো ও ট্রেকার চলে ওপার থেকে আসা যাত্রীদের ওপর ভরসা করেই। খেয়া বন্ধ থাকায় চরম সংকটের মধ্যে পড়েছেন এই পরিবহণ ব্যবসায়ীরা। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টোটো, অটো কিনেছিলেন। তাঁরা ঋণের টাকা শোধ করতে হিমসিম খাচ্ছেন।

টোটোচালক হাসান আলি ও অটোচালক মঞ্জুর আলম বলেন, ওপার থেকে আসা মানুষদের নিয়ে আমরা রায়গঞ্জ পৌঁছে দিই। তাতে প্রতিদিন ব্যবসা ভালোই চলছিল। কিন্তু খেয়া বন্ধ থাকায় ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। খুব সমস্যার মধ্যে আছি। ঘাটটি প্রতি বছর ডাক হয় সুরুন-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের পক্ষে। সেখানে নির্দিষ্ট মূল্য দিয়ে এক বছরের জন্য লিজ নেওয়ার পর এপারের বাড়িওল গ্রামেরই কিছু মানুষ সম্মিলিতভাবে খেয়া পারাপার পরিচালনা করেন। পারাপারের কড়ি দিয়ে তাঁদের সংসার চলে। ফলে এই অবস্থায় রোজগার বন্ধ হয়েছে তাঁদেরও। গোলাম মর্তুজা বলেন, আমরা গণস্বাক্ষর করে ইটাহারের বিডিও এবং ওসি থেকে শুরু করে উত্তর দিনাজপুরের জেলা শাসক ও রায়গঞ্জের এসপির কাছেও আবেদন জানিয়েছি। আমাদের বিধায়ক অমল আচার্য তাঁর একজন প্রতিনিধিকে পাঠিয়েছিলেন ওপারের বিধায়ক মেহেবুব আলমের কাছে। কিন্তু মেহেবুব আলম তাতে কর্ণপাত করেননি। আমরা চাই প্রশাসন এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হোক।

ইটাহারের বিডিও আবুল আলা মাবুদ আনসার বলেন, এর আগে বিষয়টি নিয়ে বসা হয়েছে। আমরা আমাদের তরফে চেষ্টা করছি, যাতে বিহার প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমস্যার সমাধান করে খেয়া পারাপার চালু করা যায়। বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছি।