সমাজ ধর্মনিরপেক্ষ হলেই উৎসব জাতীয় রূপ পায়

182

দেবপ্রসাদ রায় : বহুত্ববাদ ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি। কিন্তু ধর্মীয় রেষারেষিতে দেশের এই বৈশিষ্ট্য আজ কোণঠাসা। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‌্যও ধর্মীয় বেড়াজালের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। মকর সংক্রান্তি, লোহরি, হোলি, লোসার, ইস্টার ইত্যাদি সবই ধর্মের বাঁধনে বাঁধা পড়ে আছে।  হয়তো সেই কারণে কোনও উৎসবই জাতীয় উৎসব হয়ে উঠতে পারেনি। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেন বটে, দুর্গাপুজো, দেওয়ালি সারা দেশে এত আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়, তারপরও মানতে হবে যে আমাদের কোনও জাতীয় উৎসব নেই? পালিত অবশ্যই হয়। শুধু তাই নয়, পুজোর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন নানা পুজো যোগ হচ্ছে তালিকায়। কিন্তু দেশের সব ধর্মের মানুষ কি বলতে পারে, এই উৎসব আমার! আজও সহিষ্ণুতার বাতাবরণ পুরোপুরি কলুষিত হয়নি বলে হয়তো সব ধর্মের মানুষ আমাদের পুজোর অঙ্গনে ভিড় করে। কিন্তু সবাই তো অঞ্জলি দিতে পারে না। তাই দুর্গাপুজোকে জাতীয় উৎসব বলি কী করে!

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে কবিগুরু পথে নেমেছিলেন। হাতিয়ার করেছিলেন রাখিবন্ধন উৎসবকে। আমার সীমিত জ্ঞানের পরিধি বুঝতে সাহায্য করেনি যে, এই উদ্যোগে বাংলার মুসলিম সমাজ কতটা যুক্ত হয়েছিল। অথচ ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ডাক সার্বিকভাবে মুসলিম সমাজের সাধুবাদ কুড়িয়েছিল। কারণ নবগঠিত দুই প্রদেশ (অসম ও পূর্ববঙ্গ) জনবিন্যাসের দিক থেকে দুই-তৃতীযাংশ মুসলিম অধ্যুষিত হয়ে গিয়েছিল এর ফলে। উৎসবকে হাতিয়ার করে গণ আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানেও হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও কবিতা নিষিদ্ধ হওয়ার পর ১৯৬৫ সালে ঢাকায় ছায়ানট (সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী) রমণার মাঠে বটবৃক্ষের নীচে গড়ে তোলে এক আন্দোলন, যার পরিচিতি ঘটে নববর্ষ উৎসব নামে। পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের খোলস থেকে যে বাংলাদেশ বেরিয়ে এল, তার পিছনে এই নববর্ষ উৎসবের অবদানকে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করে। এখন স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মগন্ধহীন নববর্ষ উৎসব কিন্তু জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমাদের রাখিবন্ধন মূলত হিন্দুদের উৎসব হিসেবেই থেকে গিয়েছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ রাখিবন্ধনের মাধ্যমে অন্য বার্তা দিয়েছিলেন বটে। কিন্তু রাখিবন্ধন প্রথাগতভাবে হিন্দুদেরই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব বলে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে।

- Advertisement -

আমরা স্বাধীনতার পর চাইলে প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনকে জাতীয় উৎসবের চেহারা দিতে পারতাম। ধর্মের গণ্ডির বাইরে এই দিনটিকে ঘিরে আবেগ যা আছে, তাতে সবার উৎসবে পরিণত হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনা ছিল। গোয়ার কার্নিভাল কিন্তু ধর্ম ছাড়াই টিকে আছে বহুদিন ধরে। আবার স্বল্পদিনের মধ্যে নাগাল্যান্ড তার হর্নবিল ফেস্টিভালকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। আসলে ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। সমাজেও ধর্মনিরপেক্ষতার মূল থাকা উচিত। সেই পরিবেশ না গড়ে উঠলে রাজনৈতিক ভাবনা, কর্মকাণ্ড ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না। সেই দায়বদ্ধতা পালিত হয়নি বলেই আজ এই সংকটের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। অসম সীমানার কাছে আলিপুরদুয়ার শহরে প্রজাতন্ত্র দিবসে গত ছয় বছর ধরে সংহতি উৎসব পালিত হচ্ছে। স্থানীয়রাই শিল্পী সেই অনুষ্ঠানে। তবে বৈচিত্র‌্য আছে। আরও ভালো করে বললে, বৈচিত্র‌্যই এই উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য। বহুত্ববাদী দেশে বৈচিত্র‌্য যেমন জাতীয়স্তরে, বৈচিত্র‌্য তেমনি স্থানীয়স্তরেও আছে। সংহতি উৎসব প্রথম থেকে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‌্যকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিস্তাবঙ্গ সংহতি উৎসবের অঙ্গন থেকে যে সুর শোনাতে চাইছে, গঙ্গা পেরিয়ে বাংলার শাসনক্ষেত্র কলকাতাকে সেই সুর শোনাতে পারবে কি না, তা কেবল সময়ই বলবে। মনে রাখা দরকার বৈচিত্র‌্যই একতা অথবা বৈচিত্র‌্যময় সহাবস্থান। সহাবস্থানের পূর্বশর্ত হল সহিষ্ণুতা।

(লেখক প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ)