আর আ-মোদি-ত নন আমেরিকান বাঙালিরা, পালটেছে মমতা-দর্শনও

506

শুভঙ্কর মুখোপাধ্যায়

মমতা জিতলেন? নাকি মোদি হারলেন? বস্তুত, এই দুইটি সমীকরণই সত্য। কিন্তু তর্কবাগীশ বাঙালি এত সহজে ছাড়বে কেন! পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ভোটগণনার সময় আমেরিকা প্রবাসী বাঙালিদের রাত জাগা দুটি চোখ আটকে রইল টিভি বা কম্পিউটার বা সেলফোনের পর্দায়! অবশেষে এই পরবাসী পর্দানশিন বাঙালি সিদ্ধান্তে পৌঁছোল, কেউ হারেনি, কোনও দল জেতেওনি। জিতেছেন একা একজন মহিলা ইতিহাস যাঁকে মমতা নামে মনে রাখবে। বিরোধীদের বিশেষণ মাফিক ওই মহিলা, মমতা ছিলেন বলেই রাবি টাকোরের সুনার বাংলা হেরে গেল আদ্যিকালের বাঙালিয়ানার কাছে।

- Advertisement -

কী সেই বাঙালিয়ানা? আমেরিকান প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, তাঁরা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি যে, বহু আলোচিত গুটখা সংস্কৃতির লোকেদের কাছে হেরে যেতে হবে রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ-সুভাষচন্দ্রের ঐতিহ্যকে। তাঁরা মনেপ্রাণে চেয়েছেন, আপাতভাবে হলেও পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু-মুসলিমের ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় থাক। তাঁরা পছন্দ করেননি যে, একজন মহিলা, তা তিনি যতই রগচটা বা মাঝে মাঝে উলটো-পালটা বলুন না কেন, তাঁকে নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে তামাশা করবে।

আমেরিকায় বাঙালি মহলে একটা চর্চা চলছে। পরিশুদ্ধ বাঙালিয়ানার এই চাহিদাগুলি ধরতেই পারেননি মোদি, তা তিনি অন্যত্র যতই ম্যাজিকাল হোন না কেন। বিপরীতে মমতা এই বাঙালিয়ানাটা বুঝতে পেরেছেন বলেই, মোদির পরিবর্তনের ডাককে হারিয়ে দিয়েছে তাঁর এক মাসব্যাপী ভাঙা পায়ের যাত্রাপালা! রুচিশীল শব্দের বদলে গোটা রাজ্যে হিট করে গিয়েছে তাঁরই সংলাপ।

অথচ আদতে মার্কিন বাঙালিদের মধ্যে Modi-Fied লোকের সংখ্যা কম ছিল না। তাঁদের অনেকেরই মোদির ব্যাপারে একটা দুর্বলতা ছিল, যেমন ছিল ট্রাম্প সম্পর্কে। মনে মনে তাঁরা অনেকেই হিন্দুত্বের ধারণাকে লালন করেছেন। অপছন্দ করেছেন মমতার অতিরিক্ত সংখ্যালঘু তোষণকে। সেই তাঁরাই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে মোদির ভূমিকাকে মেনে নেননি।

কারণ এক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর মসনদ থেকে নেমে আরএসএসের ক্রীতদাস এক বিজেপি নেতায় ধর্মান্তরিত হয়েছেন এবং এটা উনি করেছেন স্রেফ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোটে হারানোর জন্য। তাও সেটা কীভাবে? অনেককেই বলতে শুনছি, মোদি একজন মুখ্যমন্ত্রীকে হারানোর জন্য নিজের রাষ্ট্রকে লেলিয়ে দিয়েছেন। সিবিআই, ইডি, নির্বাচন কমিশন এমন আচরণ করেছে যে, মনে হয়েছে, তারা মমতার ব্যক্তিগত শত্রু। একলা লড়াকু এক ৬৫ বছরের মহিলার রাজনীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপ্রধান মোদির এই ব্যক্তিগত অ্যাজেন্ডা মার্কিন মুলুকের আমবাঙালি মোটেই মেনে নিতে পারেননি। মমতা তাঁদের প্রশ্নহীন পছন্দের নেত্রী না হওয়া সত্ত্বেও, তাঁরা এখন বলছেন, মহিলা কিন্তু দেখিয়ে দিয়েছেন!

এমন যদি না হত, ব্যাপারটা যদি প্রধানমন্ত্রীর পরিভাষায় পিসি-ভাইপোর বিরুদ্ধে নরেনজির ইজ্জত কা সওয়াল না হত, তাহলে বিচারে আসত মমতার বিস্তর নেতিবাচক দিক। তাঁর দশ বছরের শাসনের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বেশ চড়া ঢেউ ছিল রাজ্যজুড়ে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ও অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ করেছেন। তিনি পুলিস-প্রশাসনকে দলদাসে পরিণত করেছেন, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি কায়ে করেছেন। নারদ-সারদা থেকে শুরু করে সিন্ডিকেট ও তোলাবাজির ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে মমতার লোকজনের বিরুদ্ধে। তাই বলে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ে না গিয়ে একজন প্রধানমন্ত্রী তাঁর দেশের একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে ইভটিজারদের মতো অঙ্গভঙ্গি করে, দিদি, ও দিদি বলে ব্যঙ্গ করবেন! প্রধানমন্ত্রীর এই আচরণে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজ্যের অন্য দলগুলিও একজন মহিলা নেত্রীকে মাননীয়া বা মিথ্যাবাদী মহিলা বলে বিদ্রুপ করবে! রাজ্যে মোদিজির স্বয়ংসেবকরা ওই মহিলাকে বারমুডা পরতে বলুন বলে লম্পটদের মতো তামাশা করবে! মমতাকে পছন্দ না করলেও, তাঁর বিরুদ্ধে এমন অশালীন সামাজিক আক্রমণ আমেরিকার বাঙালি সমাজ সংগত কারণেই মেনে নিতে পারেনি।

মমতা জিতে যাওয়ার পরে অনেককে সোচ্চার দেখছি, উনি পেরেছেন। উনি কী পেরেছেন? উনি উদার ও মুক্তচিন্তার বাংলার গায়ে সাম্প্রদায়িকতার দাগ ধরিয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত রুখে দিতে পেরেছেন। ব্যাস, আপাতত এটুকুই যথেষ্ট। বাকিটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে।

আমেরিকান বাঙালিদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারছি, আর একটা বিষয় মোদির পাল থেকে বাতাস কেড়ে নিয়েছে। সেটা হল, করোনা প্রতিরোধে মোদির চরম অবহেলা। দেশের এই মর্মান্তিক করোনাকালে একজন প্রধানমন্ত্রী একটা রাজ্যের ক্ষমতা দখলের খেলায় মাতবেন, এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ক্ষমার অযোগ্য। এই ব্যাপারটায় কিন্তু আমেরিকাবাসী অবাঙালি ভারতীয়দেরও মোদি-রতার মোহভঙ্গ ঘটেছে অনেকটা। এঁরাই একদা হাউডি মোদি বলে নরেনভাইকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। এখন তাঁরাই বলছেন, মমতাজি নে কামাল কর দিয়া!

একটা সময় করোনা মোকাবিলায় ভারত বেশ ভালো জায়গায় চলে গিয়েছিল। ঠিক এরকম একটা সময়ে মোদি কেন যে ৫ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন আর কুম্ভমেলা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, সেটা কারও বোধগম্য হচ্ছে না। এমন সংকটের কালে করোনা সামলানোর কাজকে কিছুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের নিত্যযাত্রী হয়ে গেলেন, কেবলই মমতাকে হারানোর জন্য। এমন রাষ্ট্রপ্রধানকে আমেরিকার অনাবাসী ভারতীয়রা স্বভাবতই ভালো চোখে দেখছেন না।

কে-ই বা দেখছেন! সিএনএন থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্ক টাইমস সহ এ দেশের সবকটা প্রভাবশালী গণমাধ্যম ভারতের ভয়ংকর করোনা পরিস্থিতির জন্য মোদির নিন্দায় মুখর। এমনকি ল্যানসেট ও হুর রিপোর্ট মুখে মুখে ঘুরছে। আগে এখানে চৈনিক দেখলেই আমেরিকানরা করোনা ছড়ায় বলে তাঁদের এড়িয়ে যেতেন। এখন ভারতীয় দেখলেই মার্কিনরা বলছেন, ইওর প্রাইম মিনিস্টার ইজ নট অ্যাট অল রেসপন্সিবল! মোদির জন্য এখানে অনাবাসী ভারতীয়দের মাথা হেঁট হঠাৎ। মার্কিন বাঙালিরা এতদিনে বলছেন, আমাদের ঘরের মেয়ে মোদিকে উচিত শিক্ষা দিয়েছে ! আমরা আর আ-মোদি-ত নই!

মমতার কাছে মোদির পরাজয় আরও একটি কারণে আমেরিকার অনাবাসী বাঙালিদের কাছে গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। সেটা হল, মোদিকে হারিয়ে মমতা একাই জাতীয় রাজনীতিতে একটা নতুন সমীকরণের জন্ম দিতে চলেছেন।

অথচ এবার তো মোদি শুধু মমতার কাছে হারেননি, তিনি কেরলে হেরেছেন, তামিলনাডুতে হেরেছেন। কিন্তু ঘোর বাস্তবটা হল, এই দুই রাজ্যে বিজেপি হেরেছে, ব্যক্তি মোদি নয়। অথচ ভারতে হালে বিজেপির যে রমরমা, তা তো মোদিকে দেখিয়ে, ঠিক যেমন তৃণমূল জেতে একা মমতার জোরেই। সেই মোদি এবার ভিখ মেগেছিলেন, মুঝে বঙ্গাল চাহিয়ে মমতা সেই মোদিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমঝে দিলেন, মোদি বাংলায় চলবে না! মোদির মুষল পর্বে মমতার এই চ্যালেঞ্জ তাঁকে দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের কাছে নতুন নেত্রী বানিয়ে দিল। এই জোট যদি সার্থক হয়, তাহলে মোদির দেশবেচার মতলব, ভারতকে হিন্দুস্তান বানানোর ফন্দি মাঠে মারা যাবে। ঠিক এই কারণেই মমতাকে সামনে রেখে মার্কিন বাঙালিরা ভাবতে শুরু করেছেন, উনি পারবেন!

ইতিহাস কত দ্রুত পালটে যায়। এতদিন আমেরিকায় আছি। কখনও মমতাকে নিয়ে এখানে এত প্রশংসাসূচক চর্চা দেখিনি। হয়তো ওই মহিলার জন্যই বাঙালি আরও একবার মাথা উঁচু করে বলবেন, হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে, ইন্ডিয়া উইল থিংক টুমরো!

(লেখক সাংবাদিক, আমেরিকার ন্যাশভিলের বাসিন্দা)