রহিত বসু, ২৫ এপ্রিলঃ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি নরেন্দ্র মোদিকে উপহার পাঠান, তাহলে আমার কিছু যায় আসে না, আপনারও নিশ্চযই কিছু যায় আসে না। আমার শুধু জানতে ইচ্ছে করে, মোদি কি কোনো রিটার্ন গিফট দিলেন, নাকি ওটা ফল ঘোষণা পর্যন্ত বকেয়া থেকে গেল?

অন্য সময় হলে হয়তো কুর্তা-মিষ্টি পাঠানো নিয়ে এত কথা হত না। কিন্তু এখন ভোটের সময়। এই মরশুমে অনেক সাধারণ কথাও জটিল হয়ে যায়। যেমন, অনেকে জানতে চাইছেন, মমতার উপহার পাঠানোর কথা জানিয়ে মোদি কি সৌজন্য প্রকাশ করলেন, নাকি চতুর্থ দফা ভোটের আগে মমতাকে চাপে ফেলে দিলেন। ভোটের সময় সহজ কথা ততটা সহজ থাকে না। যেমন, আসানসোলের তৃণমূল প্রার্থী মুনমুন সেন ভোটের প্রচারে বলছেন, মায়ের আত্মার শান্তির জন্য সবাই যেন তাঁকেই ভোট দেন। এমনিতে নিষ্পাপ কথা, এর মধ্যে মায়ের স্মৃতি আঁকড়ে থাকার আবেগ রয়েছে। কিন্তু ওই বক্তৃতা শোনার পর অনেকে বলতে শুরু করেছেন, সুচিত্রা সেন তো আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন। তাহলে শুধু শুধু চারটে ভোটের জন্য তাঁকে নিয়ে আবার টানাটানি কেন?

আমাদের এখানে ভোটে জাতপাতের কথা আসে, ধর্মের কথা আসে, ব্যক্তিগত কথা আসে। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন যে কত বড়ো সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে অথবা সেই পরিবর্তনের প্রভাব ঠেকাতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সেসব কথা নেতাদের বক্তৃতায় আসে না। এই যে আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, ভারতীয় অর্থনীতির বিকাশ যতটা হওয়ার কথা ছিল তার থেকে অন্তত ৩১ শতাংশ কম হয়েছে, তা নিয়ে কি নেতাদের মাথাব্যথা আছে? এখানকার ভোটে আকর্ষণ ও মাথাব্যথার অন্য অনেক কারণ রয়েছে। যেমন, বুনিয়াদপুরের সংবাদপত্র বিক্রেতা বললেন, ভোট তো আমি তৃণমূলকেই দেব। কিন্তু এলাকার নেতা যা মাতব্বরি করে, তাতে পাবলিক কাকে দেবে জানি না।

রায়গঞ্জের টায়ার মেকানিক বললেন, এবার তো বড়ো ফুল চলছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বিজেপি কী করেছে আপনার জন্য? জিনিসের দাম কমেছে? দিল্লির গভর্নমেন্ট আপনাকে কোনো সুবিধা দিয়েছে? দিদি তো বরং অনেক কাজ করেছেন। রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, স্কুলের বাচ্চাদের সাইকেল, টাকা, সব দিয়েছেন। টায়ার মেকানিকের সরল জবাব, দিল্লির ভোটে দিদির কী কাজ? দিদি কি প্রধানমন্ত্রী হবে? ২১ সালে দিদিকে দেব। আমি বললাম, দিদি তো বলছেন, ৪২-এ ৪২ হলে দিল্লির সরকার চালাবেন। টায়ার মেকানিকের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে পাশ থেকে এক অবাঙালি ব্রাহ্মণ বললেন, দিল্লিতে অনেক বড়ো বড়ো দিগ্গজ বসে আছে। দিদিকে তারা চেয়ার ছেড়ে দেবে নাকি? রাহুল গান্ধি কি দিদিকে চেয়ার ছেড়ে দেবে?

মালদার এক সরকারি ব্যাংকের গেটের সামনে স্ত্রীর সঙ্গে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বৃদ্ধ কৃষক। প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাঁর বাড়ি, ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষক দম্পতির ক্ষোভের কারণ, তাঁর পরিচিত সকলেই সরকারি ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, কিন্তু তিনি পাননি। ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত লাগতেই তাঁর পছন্দের ফুল বদলে গিয়েছে।গাজোলে এক বেসরকারি সংস্থার কর্মী বললেন, নোটবন্দির জন্য দেশের অনেকের ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু নোটবন্দির প্রভাব তাঁর গায়ে লাগেনি। তাঁকে এটিএম-এর লাইনেও দাঁড়াতে হয়নি। কারণ, তিনি যা রোজগার করেন তাতে সংসারের জন্য খরচ করার পর ব্যাংকে রাখার মতো অবশিষ্ট কিছু পড়ে থাকে না। অতএব তাঁর জীবনে এটিএম নেই।

আমি বললাম, আমাদের দেশে তো রাষ্ট্রপতি প্রধান ব্যবস্থা নয়, সংসদীয় ব্যবস্থা। মোদি তো দেশের সব কেন্দ্রে প্রার্থী নন। তাহলে মোদিকে ভোট দেওয়ার কথা আসছে কেন? আমরা কি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করছি? আপনি তো ভোট দেবেন নিজের কেন্দ্রের প্রার্থীকে। তৎক্ষণাৎ জবাব এল, বাঁচতে চাইলে মোদি। অর্থাৎ, সব আবেগের কথা, এর মধ্যে যুক্তি খুঁজতে গেলে ভুল হবে। যাঁরা এমন বলছেন, তাঁরা একবারও জানতে চাইছেন না, বিদেশ থেকে কালো টাকা ফেরানোর কী হল, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষের কী হল, বেকারের চাকরির কী হল অথবা কৃষক আত্মহত্যার সমাধান কোন পথে? এসব ছেড়ে শুধু ফুল নিয়ে আলোচনা। কোন ফুল যে কখন রং এবং আকার বদলেছে, বাক্স খুললেই তা বোঝা যাবে।