ভালো কাজের জন্য, ভালো সুযোগের জন্য স্যরের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করত

265

অতনু ঘোষ, পরিচালক

সে এক স্বপ্নের সময়কাল। সিনেমার প্রতি আকর্ষণের একেবারে গোড়ার পর্ব থেকেই আমরা কয়েকজন বন্ধু ছিলাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ে একনিষ্ঠ ভক্ত। দেশ-বিদেশের সিনেমা দেখে ও বই পড়ে এই মাধ্যম সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল তার সঙ্গে কোথায় যেন উনি সহজেই মিলে গিয়েছিলেন। আদর্শ অভিনেতা তো তিনিই যাঁর অভিনয়শৈলী একেবারে আধুনিক আর শিক্ষার পরিধি অনেকটা বড়। এই উপলব্ধির সূত্র ধরেই ওঁর সিনেমা ও নাটক দেখার শুরু। এমনকি, এমএ ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষার মাঝেও আমি নন্দনে অপরিচিত ও সংসার সীমান্তে দেখতে গিয়েছি। কারণ ওই দুটো সিনেমাই দেখার তালিকায় বাদ পড়েছিল।

- Advertisement -

সামনাসামনি প্রথম পরিচয় ২০০৪ সালে টেলিফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পর। অভিনেতা বাদশা মৈত্র আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। প্রচুর মানুষের ভিড় ছিল। তাই আলাদাভাবে বেশি কথা বলার সুয়োগ হয়নি। তবে উনি তো সবার সঙ্গেই খুব সহজ করে মিশতেন, কিংবদন্তির দূরত্ব রাখতেন না, তাই প্রথমবার প্রণাম করার মুহূর্তেই কেন জানি না মনে হয়েছিল- এরপর বোধহয় একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হবে। হল, ঠিক পরের বছরই। টেলিফিল্মের নাম অসমাপ্ত। এমন এক বৃদ্ধের গল্প যিনি অ্যালঝাইমার্স রোগে আক্রান্ত হয়ে স্মৃতি হারিয়ে ফেলছেন। কোনও এক রাতে নিজের বাড়ি খুঁজে পাচ্ছেন না। চিত্রনাট্য শোনানোর উদ্দেশে প্রথম যেদিন বাড়িতে গেলাম, অপেক্ষা করছি উনি কখন ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসবেন, আর হাজার হাজার টুকরো টুকরো ইমেজ ভিড় করছে চোখের সামনে। অসংখ্য ক্লাসিক সিনেমার কোলাজ কোনও এক সম্পাদক যেন অগোছালোভাবে একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন- চারুলতার অমল তুমুল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে প্রথমবার আসে, অপু ঘুম থেকে উঠে বালিশের ওপর খুঁজে পায় অপর্ণার চুলের কাঁটা,  কোচ চিৎকার করে বলে- ফাইট, কোনি ফাইট, শাখাপ্রশাখার প্রশান্ত একনাগাড়ে টেবিলের ওপর আঘাত করতে থাকে। এরই মধ্যে উনি আসেন। সেদিন যেন অতিরিক্ত চুপচাপ, গম্ভীর। সামনের সোফায় বসে একেবারেই নিরুত্তাপ গলায় বলেন, হ্যাঁ, বলো। আমার সব সাজানো লাইনগুলো মুহূর্তে হারিয়ে যায়। মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একেবারে ব্যক্তিগত একটা কথা, যেটা কোনওভাবেই এইরকম পেশাদার সাক্ষাতের ক্ষেত্রে প্রথমে আসে না-  আমার মামা আপনার সঙ্গে পড়তেন! কে মামা? বাংলার স্বনামধন্য অধ্যাপক উজ্জ্বলকুমার মজুমদার। পরে যতবার এই ঘটনাটা ভেবেছি, নিজের মনে হেসে ফেলেছি। কয়েক বছর বাদে আমার প্রথম সিনেমা অংশুমানের ছবি-তে পরিচালক অংশুমান প্রথমবার অভিনেতা প্রদ্যুৎ-এর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ওই সংলাপটি বলেছিল, আমার মামা আপনার সঙ্গে পড়তেন! পরিচালক ও অভিনেতার ভূমিকায় ছিলেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

সেদিন কিন্তু অসমাপ্ত চিত্রনাট্য শোনানো হয়নি। বলেছিলেন, রেখে যাও। পড়ব। শুধু বিষয়টা শুনলেন মন দিয়ে আর বললেন, অসমাপ্ত নামটা সুন্দর। এরপরে শুটিংয়ের আগে একবার ফোনে কথা হল। বললেন, একটা বই জোগাড় করেছি অ্যালঝাইমার্সের ওপর। পড়ছি। শুনে ভীষণ আনন্দ হয়েছিল। মিলে গেল আদর্শ অভিনেতার ধারণার সঙ্গে। শুটিং করতে গিয়ে দেখলাম, একজন কিংবদন্তি অভিনেতাও কতটা পেশাদার হতে পারেন কাজের ক্ষেত্রে। সিনেমা যে পরিচালকের মাধ্যম এই ধারণা ওঁর মধ্যে ছিল পুরোমাত্রায়। অভিনয় সম্পর্কে অতখানি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কখনও নিজের ধারণা জোর করে পরিচালকের ওপর চাপিয়ে দিতেন না। সবসময় চেষ্টা করতেন পরিচালকের ভাবনার সঙ্গে সেগুলোকে মিশিয়ে দিতে। আর যেখানেই দেখতেন তাঁর অভিনয়ে জন্য একটুখানি জায়গা বরাদ্দ রয়েছে, সেই ছোট্ট একফালি জমিকে ফুটবল মাঠ করে দিতে ওঁর জুড়ি ছিল না। সামান্যতম সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য উনি মুখিয়ে থাকতেন। সেই দৃশ্য বা শট-এর আগে ওঁর অস্থিরতা বেড়ে যেত। মুখটা গম্ভীর, কখনও কঠিন। আড্ডা, রসিকতা সব বন্ধ। আর যদি সেই মুহূর্তে বিরক্তিজনক কোনও অন্তরায় সৃষ্টি হয়, তা হলে কিন্তু মেজাজ অশান্ত হয়ে উঠতই। একবার একটা টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। বলেছিলেন, আমি চিরকাল নিজের অভিনয়কে সমালোচকের দৃষ্টি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি, ভুল শোধরানোর চেষ্টা করেছি। হয়তো সেই কারণে এত বছর পরেও অভিনয়ে প্রতি উৎসাহ আজও বেঁচে আছে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, উৎসাহটা বেড়েছে কি? সরাসরি বলেছিলেন হ্যাঁ ভালো কাজ পেলে, ভালো সুয়োগ পেলে। তাকিয়ে দেখেছিলাম চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।

কিন্তু কাজটা যখন ভালো নয়? তেমনও তো হয়। উনি নিজেই বলেছিলেন, বেশিরভাগ দিনই হয়। একবার কোনও স্টুডিওতে দেখা করতে গিয়েছি। একটা সিনেমার শুটিং। চারদিকে অনেকের ছোটাছুটি। চূড়ান্ত অস্থিরতা, কনফিউশন। কী কী যেন হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। এরই মাঝে বসে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মুখে একরাশ অন্যমনস্কতা। আমি গিয়ে আমার শুটিংয়ের বিষয়ে কিছু দরকারি কথা সেরে নিচ্ছি। হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে এক সহকারী পরিচালক এসে ওঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, স্যর, লুঙ্গির সিনটা এখন করা যাচ্ছে না, পাজামাটা দিতে বলি? উনি মুখ তুলে তাকালেন, হ্যাঁ, কিছু একটা দাও যেটা পরতে পারি! ছেলেটি চলে যাওয়ার পর আমার দিকে ফিরলেন। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। এমন করেই কিন্তু প্রতিকূল অনাসৃষ্টির পরিবেশের মধ্যেও টিকে থাকতেন তিনি। একবার কোনও একটি মেগা সিরিয়ালের মেক আপ রুমে দেখা করতে গিয়েছি। সেদিনের দৃশ্য তখনও লেখা হচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত পরেই ওঁর সামনে এল তিন পাতার সংলাপ। সেটা হাতে ধরেই বললেন, তোদের কতবার বলি আমায় বোবা করে দে। তা হলে আমি অভিনয়ের সুযোগটা পাই। সবাই জানেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ে দুরন্ত রসবোধ সম্পর্কে। কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল ওটাই বোধহয় পাঁচ দশকের ওপর অভিনেতা হয়ে বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ।

দুটি টেলিফিল্ম, অংশুমানের ছবির ঠিক চার বছর বাদে রূপকথা এবং তারও পরে ময়ূরাক্ষী করতে গিয়ে পেয়েছিলাম এক নতুন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। একেবারে ইমপ্রম্পটু অ্যাক্টিং যাকে বলে- খোঁচা খোঁচা সংলাপ বলছেন, কখনও গতি বাড়াচ্ছেন বা কমাচ্ছেন, অপরিশীলিত উচ্চারণ, হঠাৎ করে আবেগের ওঠাপড়া, সামনে যেন চমকে দিচ্ছেন দর্শককে। ছেলেমানুষের মতো অস্থির হচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের আগে। কখনও মেজাজ চড়িয়ে বলছেন, আমার ইম্পর্ট্যান্ট সিন আছে। আমি এখন একটাও ছবি তুলব না। কখনও বা আশ্রয় নিচ্ছেন স্বভাবসিদ্ধ পরিহাসের ঘেরাটোপে- আরে কেন বোঝো না তোমরা, আমি একজন বুড়ো দুর্বল অভিনেতা। তার ওপর সারা ইন্ডাস্ট্রি জানে আমি কানে কালা। আসলে এগুলো সবই কিন্তু ওই নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার তাগিদে। স্যরের চলে যাওয়ার পর তাঁরই কবিতার লাইন হঠাত্ মনে পড়ে গেল, এবার হয়তো ধন্যবাদ জানানোর সময়/ যা কিছু পেয়েছি তার জন্য।