শিলা পুঁতে লুট হচ্ছে ১০০ দিনের টাকা

369

শুভঙ্কর চক্রবর্তী : কয়েক মাস আগের কথা। দিনহাটা ভিলেজ-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার এক বাসিন্দা সকালে নিজের জমিতে গিয়ে দেখেন, সেখানে একটি ফলক লাগানো। ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পে তাঁর জমির উন্নয়ন হয়েছে, সেজন্য খরচ হয়েছে লক্ষাধিক টাকা ইত্যাদি বিশদ লেখা রয়েছে ফলকটিতে। অথচ তাঁর জমিতে কেউ এক কোদাল মাটিও ফেলেনি। কাজকর্ম ফেলে তিনি গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তরে গিয়ে জানতে পারলেন, তাঁর জমির উন্নয়নে কাজ শেষ হয়েছে জানিয়ে প্রকল্পের বরাদ্দ সব টাকা তুলেও নেওয়া হয়েছে। তাহলে ফলক পোঁতার কারণ কী? সরকারি পোর্টালে উন্নয়ন প্রকল্পের ছবি আপলোড করা বাধ্যতামূলক। প্রকল্পের বিস্তারিত বর্ণনা লেখা শিলার ছবি পোর্টালে আপলোড করে দিলেই হল। এজন্য গ্রামে গ্রামে এখন শিলা পোঁতার ধুম। গ্রামে দেখবেন পুকুরপাড়ে, গলির মুখে, মাঠের মাঝখানে, এমনকি বাড়ির উঠোনেও শিলা পোঁতা। কেঁচো সার তৈরি, কুলগাছের চাষ, কলতলা সংস্কার, বাড়ির নালার জল পরিস্রুতকরণ, শৌচাগার নির্মাণ ইত্যাদি হরেক প্রকল্প। হরির লুটের বাতাসের মতো লুট হচ্ছে একশো দিনের প্রকল্পের টাকা।

অথচ এই প্রকল্পে গরিবি ঠেকানোর দাবি করে প্রশাসন। কয়েকদিন আগে কোচবিহারের জেলা শাসক পবন কাদিয়ান একদিনের তথ্য দিয়ে জানিয়েছিলেন, সেদিন জেলায় একসঙ্গে ১ লক্ষ ৪৫ হাজার মানুষ একশো দিনের প্রকল্পে কাজ করেছেন। মালদা জেলা পরিষদের এক কর্তা দাবি করেন, তাঁরা একশো দিনের কাজ দিয়ে ভিনরাজ্যে যাওয়া ঠেকাবেন। নির্মম বাস্তব হল, কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও ভিনরাজ্যে পাড়ি চলছেই। একশো দিনের প্রকল্প যথায়থ রূপায়ণ হলে কিন্তু কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টিতে গ্রাম বাংলার ছবিটা পালটে যেত। এই লুটে গ্রাম পঞ্চায়েত সচিব থেকে বড় পদের আমলা, সময় মতো কমিশন ঢুকে যায় সবার পকেটে। আমি একজন পঞ্চায়েত প্রধানকে জানি, যিনি নিজের নামটাও ঠিকমতো লিখতে পারেন না। কাগজে-কলমে সব ঠিক দেখিয়ে তাঁর পক্ষে সরকারি প্রকল্পের টাকা চুরি করা কি সম্ভব? আসলে চুরিবিদ্যেটা সরকারি আধিকারিকরাই ওইসব টিপছাপ নেতাদের বুঝিয়ে দেন। বদলে নিজেদের কমিশন সুনিশ্চিত করেন। লুটের এই কারবারে জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি যুক্ত সরকারি আধিকারিকদের একটা বড় অংশও।

- Advertisement -

উপভোক্তা অর্থাৎ যাঁরা প্রকল্পের সুবিধা পান, তাঁরাও কিন্তু ধোয়া তুলসীপাতা নন। যে বাড়ির কলতলা আগে থেকেই কংক্রিটের, সেই কলতলার পাশে একটি শিলা পুঁতে ছবি তুলে মালিকের হাতে হাজার টাকা ধরিয়ে চলে যান পঞ্চায়েতকর্তারা। বাড়িতে বসে হাজার টাকা পেয়ে মালিকও মহা খুশি। শৌচাগার থাকলে উপভোক্তা তালিকায় নাম তুলে সেই বাড়ির মালিকের হাতে সামান্য কিছু টাকা ধরিয়ে বাকিটা হাপিস করে দেওয়া হচ্ছে। আর যেখানে কাজ হয়েছে, তাও অত্যন্ত নিম্নমানের। পরিকল্পনায় ৬টি কংক্রিটের রিং থাকলে বসানো হচ্ছে ৩টি। ইট, সিমেন্ট নামেমাত্র। কিছু মানুষ অভিযোগ করেন বটে। তাঁদের জন্য অন্য ওষুধ। কালিয়াগঞ্জের একজন জানালেন, অভিযোগ করতেই দুবার তাঁর বাড়িতে বোমা মেরেছে। একমাস দোকান বন্ধ করে রেখেছিল। আদালতে গেলে কী হবে, বুঝতেই পারছেন। হ্যাপাও অনেক। গ্রাম পঞ্চায়েতে দুর্নীতির অভিযোগ জানাতে যেতে হয় বিডিও অফিসে, সেখানে কাজ না হলে এসডিও, তারপর ডিএম অফিসে। বলুন তো, কে কাজকর্ম বাদ দিয়ে এভাবে দৌড়ে বেড়াবেন?

কোথাও আবার বিরোধী দলের নেতারাও শাসকদলের কাছে কাটমানি খান। অনেক বিরোধী নেতা শুধু কাটমানির লোভে মাঝেমধ্যে অভিযোগ জানান বিডিও অফিসে। পঞ্চায়ে দপ্তরের কর্মরত আমার এক বন্ধু একশো দিনের কাজের প্রকল্পের নাম দিয়েছেন পোয়াবারো প্রকল্প। জাতির জনকের নামে প্রকল্পের নাম  মহাত্মা গান্ধি জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প। সেই প্রকল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই দুর্নীতি আমাদের সকলের লজ্জা।