পড়ুয়াদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, উদ্বেগ বাড়ছে গঙ্গারামপুরে

গঙ্গারামপুর : গঙ্গারামপুরজুড়ে স্কুল পড়ুয়াদের হাতেও চলে আসছে আগ্নেয়াস্ত্র। নয়াবাজারে খুনকাণ্ডের তদন্তে এমন ঘটনা সামনে আসায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে জেলাজুড়ে। প্রশাসনিক গাফিলতির কারণেই বেআইনি অস্ত্র সকলের হাতে চলে আসছে বলে মানছেন খোদ উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী বাচ্চু হাঁসদা। এনিয়ে তিনি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণও করেছেন। মন্ত্রীর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষও মনে করছেন, প্রশাসন কার্যত নিস্ক্রিয় হয়ে থাকার ফলেই স্কুল, কলেজের পড়ুয়া থেকে শুরু করে উঠতি যুবকদের কাছে বিভিন্ন ধরনের মাদক, আগ্নেয়াস্ত্র সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। যদিও পুলিশ-প্রশাসনের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কোনও মন্তব্য করতে চাননি দক্ষিণ দিনাজপুরের পুলিশ সুপার দেবর্ষি দত্ত।

গত ১২ নভেম্বর নয়াবাজার থেকে তপন যাবার রাজ্য সড়কের ধারে এক মৃৎশিল্পীর কারখানার সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্র টিংকু বর্মন ওরফে পচার (১৫)। গত জুলাই মাসে মদ্যপ অবস্থায় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে বচসার জেরে তাঁকে গুলি করে খুনে অভিযুক্ত ছিল নিহত ছাত্র সহ তার কয়েকজন বন্ধু। ঘটনার কয়েক মাস পরে সে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের কথা বলে বন্ধুদের। এই কারণেই তাকে খুন হতে হয়েছে বলে পুলিশের দাবি। তবে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে টিংকু বর্মন খুনে নাবালক থেকে তরুণদের হাতে কি করে আগ্নেয়াস্ত্র চলে আসছে এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে গোটা জেলাজুড়ে। সরাসরি প্রশাসনের দিকে আঙুল তুলেছেন অনেকেই। এই প্রসঙ্গে টিংকু বর্মনের স্কুল গঙ্গারামপুর ব্লকের নয়াবাজার উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক মোজাম্মেল হক জানান, কিশোরদের হাতে অবাধে আগ্নেয়াস্ত্র চলে আসছে কীভাবে তা প্রশাসনের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

- Advertisement -

হিলি সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক অভিজিৎ সরকার বলেন, আমরা আতঙ্কে রয়েছি। প্রশাসনের ঢিলেমি ভাব আছে, একথা অস্বীকার করবার উপায় নেই। এখনই প্রশাসন সঠিক পদক্ষেপ না করলে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটে যেতে পারে। গঙ্গারামপুর পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান অসিত চৌধুরী বলেন, নয়াবাজারের টিংকু বর্মনের খুনের ঘটনা গোটা এলাকাতেই আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তরুণ বা কিশোরদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র আসছে। এটা সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার। ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে এরা যেকোনও সময় খুন করতে পারে। পুলিশ-প্রশাসনের উচিত, অবিলম্বে বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র কারবারীদের গ্রেপ্তার করে তাদের ঘাঁটিগুলি ভেঙে দেওয়া। বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য নীলাঞ্জন রায় বলেন, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিল জেলায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কিশোরদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র আসছে। এটা যে একটা সামাজিক অবক্ষয়, তা বলতে দ্বিধা নেই।

সিপিএমের জেলা কমিটির সম্পাদক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী নারায়ণ বিশ্বাস বলেন, একদল ধর্মকে নিয়ে রাজনীতি করছে। আরেক দল অসাধু মানুষদের নিয়ে রাজনীতি করছে। তার ফল নয়াবাজারের ঘটনা। গঙ্গারামপুরের নন্দনপুর সহ জেলার বহু জায়গাতেই পুলিশ যদি সঠিকভাবে তদন্ত করে, তাহলে অনেক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হবে। প্রশাসনের চরম উদাসীনতার কারণে এই ঘটনা বাড়ছে। গঙ্গারামপুরের বিধায়ক তথা জেলা তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি গৌতম দাস বলেন, যুবকদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র আসার বিষয়টি খুবই চিন্তাজনক ব্যাপাক। খুনের ঘটনায় জড়িতরা সকলেই উঠতি বয়সের। একজন নাবালকও আছে এদের মধ্যে। এদের হাতে অস্ত্র কি করে আসছে এটা তো অবশ্যই পুলিশের তদন্ত করা উচিত। তিনি বলেন, পুলিশ তদন্তে অস্ত্র সরবরাহকারীদের খুঁজে বের করবে বলে আশা করি।

এই প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী রাখঢাক না করেই বলেন, গঙ্গারামপুর ও তপন বর্ডার এলাকাগুলোতে অসামাজিক কাজ বাড়ছে। অল্পবয়সিদের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র চলে আসছে। এখানে কোথাও গাফিলতি আছে। এটা বলবার অপেক্ষা রাখে না। কিশোরদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র আসছে তা দেখবার জন্য ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কাছে বলেছি। আবারও বলব। গঙ্গারামপুরকে আগ্নেয়াস্ত্রমুক্ত করবার দাবিও জানাব। তাঁর আরও দাবি, নেশার জোনে পরিণত হয়েছে গঙ্গারামপুর এবং এখান থেকেই গোটা জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে নানা অসামাজিক কাজের পরিকল্পনা। জুয়া ও নেশার কারণে অল্প বয়সের ছেলেরা অসামাজিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। জেলায় কোনও কারখানা নেই। স্বাভাবিকভাবেই বাইরের কোনও করিডর দিয়ে এই অস্ত্র আসছে জেলায়। বিধানসভা নির্বাচনের আগেই যাতে গঙ্গারামপুর ও তপন বর্ডার এলাকাকে আগ্নেয়াস্ত্রমুক্ত করা যায় সেই বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব।