প্রত্যাশা-আশঙ্কার দোলাচলে কাল থেকে উত্তরে ভোট

74

গৌতম সরকার : বৈরাতি নাচে কোনও ভেদ নেই। সরকারি কর্মসূচি হোক কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অথবা দলীয় সম্মেলন, অতিথিবরণে বৈরাতি নাচের বিকল্পের কথা ভাবাই হয়নি কখনও উত্তরবঙ্গে।
করম কিংবা জিতিয়া পরবে আদিবাসী ওরাওঁ, খড়িয়া, লোহারদের সঙ্গে মাদল বাজিয়ে প্রতিবেশী বাংলাভাষী কিংবা রাজবংশীদের নাচে কোনও বাধা নেই।
হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এদেশীয়রা জয় চণ্ডী সম্বোধন করলে কেউ কখনও ভাবেন না যে, এতে ধর্মবিরোধী কোনও কাজ হল। মালদার বাদিয়া সমাজ মূলস্রোতে মিশে শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে এগিয়ে চলেছে।
কোচবিহারের শুটকাবাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে মুসলমানরা এগিয়ে এলে এই প্রশ্ন কখনও ওঠেনি যে, ইসলাম বিরোধী কাজ হচ্ছে। কোচবিহারের হিন্দু মহারাজাদের ঐতিহ্য মেনে আজও ইদ, মহরমে সরকারি অনুদান মেলে হরিণচওড়ার মসজিদে।

এই আমাদের উত্তরবঙ্গ। নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতি, নানা পরিধানের মেলবন্ধন। গণতন্ত্রের নিয়মে ভোট এখানেও। শুক্রবার রাত পোহালে উত্তরবঙ্গের দুই জেলা আলিপুরদুয়ার, কোচবিহারে ভোটগ্রহণ। এরপর পর্যায়ক্রমে উত্তরবঙ্গের বাকি ৬ জেলায় ভোট চলবে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত। ভোট সংসদীয় গণতন্ত্রে সবসময় কাম্য। নির্বাচনে কেউ জিতবে, কেউ হারবে। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে সেটাই স্বাভাবিক। যদিও নাগরিক সহাবস্থান নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র টেকে না। এই সহাবস্থানের প্রথম ও শেষ শর্ত সম্প্রীতি। উত্তরবঙ্গে প্রথম দফা ভোটের প্রাক মুহূর্তে রাজনৈতিক জয়-পরাজয় ছাপিয়ে সেই সম্প্রীতির জেতা-হারার ভাবনাটাই যেন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

- Advertisement -

হ্যাঁ, দেখা দিচ্ছে। এমন ভোট আগে কখনও দেখেনি উত্তরবঙ্গ। নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতি, নানা পরিধানের উত্তরবঙ্গটাই কেমন যেন বদলে গিয়েছে। পারস্পরিক মেলবন্ধনের স্থানে বিভিন্নতার বিভাজনের আভাস যেন, যেখানে দলীয় মতাদর্শ, মানুষের জীবন-জীবিকার সমস্যা, দেশের ঐক্য ইত্যাদি ছাপিয়ে জায়গা নিয়েছে জাত, ধর্মের পরিচয়। কে ভাটিয়া (উদ্বাস্তু বাঙালি), কে রাজবংশী, কে পাহাড়িয়া, কে আদিবাসী। আদিবাসীদের মধ্যে আবার ভাগ। কেউ কৃষ্ণবর্ণের, কেউ বাদামি বর্ণের (ইংরেজিতে ব্ল্যাক ট্রাইব আর হোয়াইট ট্রাইব)।

কেন্দ্রভিত্তিক তপশিলি সংরক্ষণ চালু হওয়ার পর থেকে উত্তরবঙ্গে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তপশিলি জাতি আসনে প্রার্থী হবেন রাজবংশী সম্প্রদায়ের কেউ। তপশিলি উপজাতি আসনে অবশ্যই ব্ল্যাক ট্রাইবের (মূলত ওরাওঁ) কেউ। ভোটের কাঠে ঢাকি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজ উঠেছিল, নমশূদ্রদের তপশিলি জাতি সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী করা হবে না কেন? তৃণমূলের মধ্যেও এমন দাবি ভেসে উঠেছিল জলপাইগুড়ি জেলার কোনও কোনও কেন্দ্রে। হোয়াইট ট্রাইবরা বলতে শুরু করলেন, তাঁদেরই বা আবহমানকাল বঞ্চিত রাখা হবে কেন? হোয়াইট ট্রাইবাল গোষ্ঠীগুলির একাংশে তাই তৃণমূলের প্রতি ক্ষোভে গেরুয়া শিবিরের প্রতি প্রীতি জেগে উঠল।

তাদের প্রশ্ন যে সংগত, তাতে কিন্তু সন্দেহ নেই। তবে আগে কখনও এই প্রশ্ন ওঠেনি। আগে ওঠেনি বলে কোনওদিন উঠবে না নাকি? উঠতেই পারে। আত্মপরিচয়, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের তাগিদে উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন ভাষা, সম্প্রদায়, গোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসনের দাবি উঠেছিল আগেই। কিন্তু ভোটের লক্ষ্যে ভাষা, সংস্কৃতির ব্যবহার আগে কখনও এভাবে হয়নি। এই ভোটপর্বে পর্যবেক্ষক, সংবাদমাধ্যম সবসময় নজর রাখল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনসভায় হলুদ ঝান্ডা (গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতীক) হাতে রাজবংশীরা কেমন সংখ্যায় জড়ো হলেন কিংবা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় নমশূদ্র বা বংশীবদন বর্মনের (গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের আরেক গোষ্ঠীর নেতা) অনুগামীরা কতটা এলেন। চা বাগানের আদিবাসী শ্রমিক পরিবারগুলি অমিত শা না মমতা, কার সভায় বেশি গেলেন, ভোটের অঙ্ক কষা হল তার ভিত্তিতে।

আলিপুরদুয়ার, কোচবিহারের পর এই অঙ্ক কষা চলতে থাকে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং থেকে শুরু করে মালদায়। ধর্মীয় মেরুকরণের অভিযোগ ভাসিয়ে দিচ্ছে এই নির্বাচনে। কিন্তু উত্তরবঙ্গে তার চেয়ে বড় হয়ে সামনে এসেছে সম্প্রদায়গত ভেদ। সম্প্রদায়গত আকাঙ্ক্ষার প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গিয়েছিল পাহাড়ে একের পর এক সাংস্কৃতিক ও উন্নয়ন বোর্ড গঠনের সময় থেকে। বাক্সটা খুলেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমতলেও রাজবংশী উন্নয়ন বোর্ড, কামতাপুরি ভাষা আকাদেমি, আদিবাসী উন্নয়ন পর্ষদ ইত্যাদি গঠিত হয়েছে একের পর এক।

আকাঙ্ক্ষার বাক্সটা খুলে দিয়ে আর সামাল দেওয়া গেল না। বরং যে গোষ্ঠীগুলি কোনও বোর্ডের আওতায় এল না, তাদের ক্ষোভ উসকে ভোটের রাজনীতি শুরু করেছিল বিজেপি। ফলে বোর্ডের দাবি উঠেছে নস্যশেখ, বিভিন্ন হোয়াইট ট্রাইব ছাড়াও পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে। সেই দাবি এবারের নির্বাচনে দলীয় হাওয়ায় পুষ্ট হয়ে ডালপালা মেলার সুযোগ পেয়েছে। এর বাইরে ছিল একই জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন নেতার স্বার্থের সংঘাত। যেমন বিনয় তামাং ও বিমল গুরুং, বংশীবদন বর্মন ও অনন্ত মহারাজ, অতুল রায় ও নিখিল রায়। রাজনৈতিক দলগুলি এই ব্যক্তি সংঘাতকেও নিয়ে এল ভোটের রাজনীতিতে। ফলে জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যেও নেতাকেন্দ্রিক ফাটল চওড়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গে এই নির্বাচনে সেটাও অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

উত্তরবঙ্গে বেনজির ভোট সন্দেহ নেই। নির্বাচনি ফলাফলে যে দলই জিতুক, সম্প্রদায়গত এই আকাঙ্ক্ষা, আশা-হতাশা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ নিরসন তাদের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সেই চ্যালেঞ্জ সামলাতে না পারলে সম্প্রীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। এমন নানা সামাজিক, সম্প্রদায়গত প্রশ্ন ও সম্প্রীতি রক্ষার বিরাট দায় কাঁধে নিয়ে শুক্রবার রাত পোহালে ভোট শুরু হবে উত্তরবঙ্গে। শঙ্কা ও প্রত্যাশার দোলাচল সঙ্গে করে উত্তরবঙ্গের ভোট এবার।