বিলুপ্তপ্রায় মাছের সন্ধানে উত্তরের খাল–বিলে সমীক্ষা চলছে

1497

আলিপুরদুয়ার : হলং নদীর বোরোলি, তিস্তা–তোর্ষার মহাশির, চেকটিপু্ঁটি। রায়ডাক, মুজনাই, কালজানি নদীর পাথরচাটা মাছ। এছাড়াও  অসংখ্য নাম না জানা মাছ এক সময় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন নদী, খাল–বিল ভরে থাকত। এইসব মাছের স্বাদই বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে ডুয়ার্সে ঘুরতে আসা বাঙালিদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কিন্তু নানা কারণে অধিকাংশ মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। কয়েক বছর আগে দেখতে পাওয়া মাছগুলিও হারিয়ে যাচ্ছে উত্তরের নদী থেকে। এবার উত্তরের হারিয়ে যেতে বসা নদীয়ালি মাছের পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষার কাজ শুরু করল পশ্চিমবঙ্গ জৈববৈচিত্র্য পর্ষদ। উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলার খাল, বিল, নদী সহ বিভিন্ন জলাশয়ে নেমে এবার সমীক্ষার কাজ করছেন পর্ষদের সদস্যরা। জীববৈচিত্র্য পর্ষদের বিজ্ঞানী সৌমেন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, ‘সমীক্ষার কাজে স্থানীয় মৎস্যজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন গ্রামীণ হাটবাজারে গিয়েও মাছ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। লুপ্তপ্রায় মাছগুলির জেলাভিত্তিক তালিকা তৈরির পাশাপাশি  বিলুপ্তপ্রায় মাছগুলি সংরক্ষণের কাজ চলছে।

পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র্য পর্ষদ সূত্রে জানা গিয়েছে, এক সময় উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার জেলায় প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেতো। জেলাগুলির গ্রামীণ হাট বাজারে এত পরিমাণ নদীয়ালি মাছ বিক্রির জন্য আসত যে দাম পেতেন না স্থানীয় মৎসজীবীরা। বাধ্য হয়ে একেবারে জলের দরে ওই মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হতেন তারা। উত্তরবঙ্গের নাম করা বরোলি, মহাশির, চেকটিপুঁটি, শোল সহ একাধিক মাছ পাওয়া যেত গ্রামীণ হাট বাজারগুলিতে। পাশাপাশি এমন কিছু নাম না জানা মাছ পাওয়া যেত যা এখন আর পাওয়াই যায় না। বিশেষ করে ডুয়ার্সের খরস্রোতা নদী গুলি থেকে যে মাছ পাওয়া যেতো তাও আজ বিলুপ্তির পথে। আগামী প্রজন্ম উত্তরবঙ্গের এই মাছগুলি আদৌ দেখতে পাবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মৎসয গবেষকরা। তাই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকেই মৎস গবেষকরা জেলাভিত্তিক লুপ্তপ্রায় ও বিলুপ্ত মাছগুলি নিয়ে গবেষণা ও তাদের তালিকা তৈরির প্রস্তাব জৈববৈচিত্র্য পর্ষদে দেন। সেই প্রস্তাবের পরেই উত্তরবঙ্গ সহ গোটা রাজ্যেই বিলুপ্তপ্রায় মৎস্যকুলের সন্ধানে সমীক্ষার কাজ শুরু হয়।

- Advertisement -

আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলায় সম্প্রতি এই সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। তুফানগঞ্জ কলেজের অধ্যাপক দেবাশিস দাসের নেতৃত্বে এই কাজ এখন চলছে। ইতিমধ্যেই তিস্তা, তোর্ষা, কালজানি, রায়ডাক, সংকোশ প্রভৃতি নদীতে প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ হয়েছে। এই সমীক্ষায় যে তথ্য উঠে এসেছে তা খুব ভয়ানক বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

বিজ্ঞানী সৌমেন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, ‘কৃষিকাজে দেদার কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক মাছ আজ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের শক দিয়ে মাছ ধরা, নদী থেকে অবৈধভাবে বালি পাথর তোলার ফলেও মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আবার নদী, ঝিল, খাল–বিলগুলিতে নানা ধরনের নির্মাণ কাজ হওয়ার ফলেও মাছেদের বংশ বিস্তারে ব্যাঘাত ঘটছে। তাই এক সময় যে মাছ গুলি সহজেই পাওয়া যে আজ তা মিলছে না।’

তুফানগঞ্জ কলেজের অধ্যাপক দেবাশিসবাবু বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত সমীক্ষায় উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় মাছ বোরোলির প্রায় ৭ থেকে ৮ ধরনের প্রজাতির সন্ধান মিলেছে। তোর্ষায় প্রায় ১০৫ ধরনের দেশি প্রজাতির মাছ মিলেছে। এছাড়াও বক্সা,গোরুমারা জঙ্গল লাগোয়া জলাশয়গুলিতে বেশকিছু দুর্লভ রঙিন মাছের হদিশ পাওয়া গিয়েছে।  তিস্তা, তোর্ষা, কালজানি, রায়ডাক সহ
বেশ কিছু নদীতে আট-নয় ধরনের পাথরচাটা মাছ পাওয়া গিয়েছে। এই মাছগুলি মূলত খরস্রোতা নদীর শ্যাওলা খেয়ে বেঁচে থাকে।

প্রাণীবিদ্যার অধ্যাপক বিপ্লবকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘হারিয়ে যেতে বসা মাছ গুলির পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা করা হচ্ছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হল, মাছগুলি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণায় পৌঁছানো। কোন মাছের সংরক্ষণ দরকার, কী পদ্ধতিতে তা সম্ভব, সমীক্ষার পর এসব নির্দিষ্ট করে বলা যাবে।

তথ্য – ভাস্কর শর্মা