শিলিগুড়ি মহকুমার নদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মাছ, উদ্বিগ্ন মৎস্যজীবীরা

472

ছবি : সূত্রধর

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : শিলিগুড়ি মহকুমার বিভিন্ন নদী থেকে মাছ ধরে তা বাজারে বিক্রি করে সংসার চালান প্রচুর মৎস্যজীবী। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মহকুমার নদীগুলি থেকে মাছ কার্যত উধাও হয়ে গিয়েছে। মহানন্দা, বালাসন হোক বা সাহু, চেঙ্গা, মেচি- সব নদীতেই আজ মাছ পাওয়া ভার। এই অবস্থায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মৎস্যজীবীদের মধ্যে। কিন্তু কেন মাছ উধাও হয়ে যাচ্ছে নদীগুলি থেকে? মৎস্য দপ্তরের শীর্ষকর্তারা বলছেন, নদীতে অবাধে খনন করে  বালি-পাথর তুলে নেওযা এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলের দূষিত পদার্থ এমনকি চা বাগানে প্রযোগ করা রাসায়নিক পদার্থ নর্দমা হয়ে নদীতে এসে মেশায় নদীর জল ভীষণভাবে দূষিত হচ্ছে। এর জেরে নদীতে মাছ থাকছে না।

- Advertisement -

শিলিগুড়ি মহকুমা এবং সংলগ্ন এলাকায় মহানন্দা, বালাসন, সাহু, পঞ্চনই, বাতারিয়া, মেচি, চেঙ্গা সহ আরও কয়েকটি বড়ো নদী রয়েছে। একসময় যেগুলি সারা বছর মাছে ভরপুর থাকত। মৎস্যজীবীরাই বলছেন, আগে নদীতে জাল ফেললেই রুই, ট্যাংরা, বোরোলি, কাতলা, মৃগেল, আমেরিকান রুই, মাগুর, শিঙি সহ বিভিন্ন নদীয়ালি মাছ পাওযা য়েত। এই মাছ বাজারে বিক্রি করেই দিব্যি সংসার চালাতেন মৎস্যজীবীরা। কিন্তু আজ তা অতীত। এখন আর এই নদীগুলিতে মাছ পাওয়া যায় না। নকশালবাড়ির মধ্য কোটিয়াজোতের মৎস্যজীবী সুকেশ হালদার, ব্রজ রাজবংশীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাতারিয়া, মেচি নদীতে মাছ ধরে তা বাজারে বিক্রি করেই আমরা সংসার চালাই। পারিবারিক সূত্রে এটাই আমাদের মূল জীবিকা। কিন্তু গত তিন-চার বছর ধরে নদীতে আর মাছ আসছে না। জাল ফেললেই শুধু প্লাস্টিক, আবর্জনা জালে উঠছে। সারাদিন নদীতে কাটালেও এক কেজি মাছ বিক্রির জন্য পাওয়া যায় না। কীভাবে যে সংসারটা টানছি তা বলে বোঝাতে পারব না। মহানন্দা নদীতে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলছিলেন পূর্ব মাঝাবাড়ির মৎস্যজীবী বুদ্ধি রাজবংশী, পলান হালদার, আকালু হালদার, হাতিয়াডাঙ্গার পারো হালদার, তাসি হালদার, জীবন হালদার সহ অন্যরা। যতবারই জাল ফেলছেন ছয়-সাতটা পুঁটি মাছ ছাড়া অন্য কিছুই উঠছে না। গত ২৫-৩০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত এই মৎস্যজীবীরা বললেন, পূর্বপুরুষের আমল থেকেই আমরা নদী থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে সেই টাকায় সংসার চালাই। কিন্তু গত দুই-তিন বছর ধরে কোনো নদীতেই আর মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এই মৎস্যজীবীদের অনেকেই বললেন, সকাল ৮টায় বাড়ি থেকে জাল কাঁধে নিয়ে বেরিয়েছি। এখন বেলা ১২টা পেরিয়ে গিয়েছে। হাঁড়িতে দেখুন আড়াইশো গ্রাম মাছও হয়নি। অথচ বাড়িতে সবাই অপেক্ষায় আছে যে আমরা এই মাছ জলেশ্বরী, ফুলেশ্বরী, আশিঘরের বাজারে বিক্রি করে বাড়ির জন্য বাজার করে নিয়ে যাব। শুধু কি দুটো ভাত খেলেই হবে? ছেলেমেয়ে পড়াশোনা, চিকিত্সা কত খরচ রয়েছে। নদীতে তো মাছ নেই, কী করে সংসার চালাব বুঝতে পারছি না।

কিন্তু কেন নদীগুলিতে মাছ মিলছে না? মৎস্য দপ্তরের উত্তরবঙ্গের অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর আর ফোনিং লেপচা বলেন, নদীগুলিতে অবাধে খনন করে বালি-পাথর তুলে নেওয়া হচ্ছে। নদীর গতিপথও অনেক জায়গাতেই অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে, কোথাও পরিবর্তিত হয়েছে। অনেক জায়গাতেই অন্যায়ভাবে নদীতে বিষাক্ত কিছু প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া রয়েছে দূষণ। শহর এবং গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন এলাকার নিকাশি ব্যবস্থা এসে নদীতে মিশেছে। সেই নালা দিয়ে কত দূষিত পদার্থ নদীতে মিশছে। এর জেরেই নদী থেকে মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এটা খুব ভয়ংকর। মানুষকে সচেতন হতে হবে।