ভাতা তুলছেন অন্যজন, বঞ্চিত লোকশিল্পীরা

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : লোকশিল্পী ভাতাতেও দুর্নীতির ছায়া। প্রকৃত অভাবী অসহায় লোকশিল্পীদের একাংশকে বঞ্চিত করে চুপিসারে অবৈধ উপায়ে সচ্ছল পরিবারের শখের গানবাজনা করা ব্যক্তিদের পকেটে ফি মাসে ঢুকছে লোকপ্রসার প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থ। ফলে যোগ্য দুঃস্থ শিল্পীরা সরকারি প্রকল্পের বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ। অন্যদিকে, অন্য পেশায় যুক্ত থাকলেও রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক প্রভাবে বেআইনিভাবে একাধিক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টেও ওই প্রকল্পের বরাদ্দ, মাসে হাজার টাকা জমা হচ্ছে অভিযোগ উঠেছে। উত্তর দিনাজপুর জুড়ে কয়েক বছর ধরে শিল্পী ভাতার নামে অনিয়মটাই যেন দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাউল, ভাওয়াইয়া, খন পালাগান, সংকীর্তন প্রভৃতি লোকসংগীত থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাদক এবং তপশিলি ও আদিবাসী নৃত্য সহ লোকনৃত্যের সঙ্গে পরম্পরাগত জড়িত শিল্পীরাই মূলত এই প্রকল্পের প্রকৃত উপভোক্তা। এই ভাতার ওপর অনেক শিল্পীর সংসার নির্ভরশীল। বর্তমানে করোনা আবহে দীর্ঘ আটমাস ধরে মেলা সহ সমস্ত ধরনের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ। এমনকি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা আয়োজিত গানবাজনার আসরও স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় যে কোনও ধরনের জলসার আয়োজন স্থগিত রয়েছে। এর ফলে অসহায় গ্রামীণ লোকশিল্পীদের আর্থিক অবস্থা ভীষণ সঙ্গিন। অথচ এই অবস্থায় আর্থিক সংগতি থাকা অনেকে এই প্রকল্পের সুযোগ নিয়ে ভাতার টাকা তুলছেন। এতে আসল গরিব লোকশিল্পীরা সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রায়গঞ্জ ও ইসলামপুর মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রামের বহু দুর্বল লোকশিল্পী এই প্রকল্প নিয়ে পুরোপুরি অন্ধকারে। আর তারই সুযোগ নিয়ে অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত অনেকে শিল্পীভাতার প্রকল্পে উপভোক্তার টাকা তুলছেন।

- Advertisement -

মৃৎশিল্পী অমল দাসের বক্তব্য, আমি ২০ বছর ধরে মূর্তি তৈরি করছি। একাধিকবার আবেদন করেও এখনও পর্যন্ত শিল্পীভাতা পাইনি। আরেক মৃৎশিল্পী ভবানী দাস বলেন, করোনার জন্য প্রতিমা বিক্রি প্রায় বন্ধের মুখে। চরম আর্থিক অনটনের ভুগছি। আমরা শিল্পী হয়ে এখনও পর্যন্ত সরকারি শিল্পীভাতা পাইনি। সুভাষগঞ্জের পটশিল্পী নমিতা পাল বলেন, ৬৫ বছর বয়স হয়ে গেল। ৪০ বছর ধরে স্বামীর সঙ্গে এই কাজ করছি। একাধিকবার আবেদন-নিবেদন করেও মেলেনি শিল্পীভাতা। একই কথা জানান নমিতাদেবীর স্বামী পরেশচন্দ্র পাল। মৃৎশিল্পী চিত্তরঞ্জন পাল বলেন, শিল্পীভাতার জন্য কর্ণজোড়ায় একাধিকবার আবেদন-নিবেদন করলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। এদিকে করোনা আবহে মূর্তি বিক্রির পরিমাণেও ভাটা পড়েছে। সব প্রতিমা বিক্রি হয়নি। চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে আমাদের।

জেলা লোকপ্রসার প্রকল্প এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তর দিনাজপুরে ১৩,৮৫০ জন উপভোক্তা লোকপ্রসার প্রকল্প অর্থাৎ শিল্পীভাতার আওতায় রয়েছেন। এনিয়ে জেলা আধিকারিক রানা দেবদাসকে একাধিকবার ফোন করেও তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে রায়গঞ্জ মহকুমা শাসক অর্ঘ ঘোষ বলেন, এব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। অন্যদিকে, ইসলামপুরের মহকুমা শাসক অলংকৃতা পান্ডে বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অন্য পেশার উপভোক্তাদের নাম এই প্রকল্প থেকে বাতিল করা হবে।