চোরাপথে বঙ্গে আসছে বিদেশি সিগারেট

39

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : মিজোরামকে ঘাঁটি করে গুয়াহাটি, শিলিগুড়ি হয়ে মায়ানমার থেকে চোরাপথে কলকাতায় ঢুকছে কোটি কোটি টাকার বিদেশি সিগারেট। বেআইনি ওই কারবারে অতিসক্রিয় হয়েছে দুটি আন্তর্জাতিক পাচারচক্র। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সড়কপথে ট্রাকে করেই পাচার হচ্ছে সিগারেট। কখনও অন্য পণ্যের আড়ালে লুকিয়ে কখনও ট্রাকের পাটাতনে গোপন চেম্বার তৈরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেগুলি। শিলিগুড়ি থেকে বিভিন্ন জেলা ছাড়াও সিগারেট যাচ্ছে নেপাল ও ভুটানে। গুয়াহাটি থেকে বিদেশি সিগারেট পৌঁছে যাচ্ছে অসমের বিভিন্ন এলাকায়।

৪ অগাস্ট মিজোরামের চম্পাই জেলার রিকাউন গ্রাম থেকে প্রায় ২ কোটি টাকার বিদেশি সিগারেট উদ্ধার করে অসম রাইফেলসের জওয়ানরা। সেই ঘটনার তদন্তে তিনজনকে আটক করা হয়েছিল। তাদের কাছ থেকেই সিগারেট পাচারের বিশাল চক্রের কথা প্রকাশ্যে আসে। অসম রাইফেলস সূত্রে খবর, এই মুহূর্তে মিজোরামের চম্পাই জেলা সিগারেট পাচারের সব থেকে বড় ঘাঁটি। মায়ানমার থেকে ভারতে ঢোকার পর চম্পাইয়ের রিকাউন, মুলকাউয়াই, নগুর, রুআন্টলাং এই চার এলাকায় মজুত করা হয় বিদেশি সিগারেটগুলি। তারপর বিভিন্ন রুট ধরে সেগুলি পৌঁছে যায় গুয়াহাটিতে। সেখান থেকে শিলিগুড়ি হয়ে কলকাতায় পৌঁছায়।

- Advertisement -

বিভিন্ন নামী বিদেশি কোম্পানির সিগারেট মায়ানমার থেকে ভারতে ঢুকছে বলেই জানা গিয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানির নকল সিগারেটেরও হদিস পেয়েছেন গোয়েন্দারা। ফলে নকল সিগারেট তৈরির কারবারও চলছে বলেই মনে করছেন তাঁরা। সূত্রের খবর, শিলিগুড়ির খালপাড়াতে চোরাপথে আসা সিগারেটের একাধিক বড় ঘাঁটি রয়েছে। আলিপুরদুয়ারের জয়গাঁ ও কালচিনির চারটি গুদাম থেকে বিদেশি সিগারেট পাচার হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে। শিলিগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন শহরে দেদারে বিকোচ্ছে ওই সিগারেট।

সিগারেট পাচারের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। আগে উত্তর-পূর্বের একাধিক জঙ্গি সংগঠন চোরাকারবারিদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুসারে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করত। বর্তমানে পাচারের কাজে অংশীদারিত্ব নিচ্ছে প্রিপাক (প্রো) এবং এনএসসিএন (খাপলাং) দুই জঙ্গিগোষ্ঠী। দুই গোষ্ঠীর ২০ জনেরও বেশি ক্যাডার মায়ানমার থেকে মিজোরামে সিগারেট পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত রয়েছে। পাটাতনে আলাদা কাঠের চেম্বার তৈরি করা ৫০টিরও বেশি ট্রাক পাচারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেগুলিতে ভুয়ো নম্বর প্লেটও লাগানো থাকছে।

অসম রাইফেলসের এক পদস্থ আধিকারিকের বক্তব্য, মায়ানমার থেকে শিলিগুড়ি ও কলকাতায় কোটি কোটি টাকার বিদেশি সিগারেট যাচ্ছে। খবর পেলেই আমরা অভিযান চালাচ্ছি। ডিরেক্টরেট অফ রেভেনিউ ইন্টেলিজেন্সের আধিকারিকদেরও সতর্ক করা হয়েছে। ভয়ের কথা, সিগারেট পাচারের একটা বড় অংশের টাকা চলে যাচ্ছে দেশবিরোধী শক্তিগুলির হাতে। রাজ্য পুলিশের কোনও কর্তা এই বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। ডিআরআইয়ের এক আধিকারিক বলেন, অভিযান চলছে। শিলিগুড়ি থেকে এর আগেও আমরা কয়েক কোটি টাকার বিদেশি সিগারেট উদ্ধার করেছি। নজরদারি চালানো হচ্ছে।

চোরাপথে বিদেশি সিগারেট ঢোকায় বৈধ উপায়ে রাজস্ব দিয়ে যেসব সংস্থা বা ব্যবসায়ী সিগারেটের ব্যবসা করছেন, তাঁরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারেরও মোটা টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। কারবার বন্ধে কড়া পদক্ষেপ করার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের কর্তারা।

নর্থবেঙ্গল মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক আয়ুষ টিব্রুয়ালের বক্তব্য, বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে চিঠি লিখব। সিগারেটের চোরাকারবার বন্ধে কড়া পদক্ষেপ হওয়া উচিত।

ইস্টার্ন এবিসি চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ-এর আহ্বায়ক সুরজিৎ পাল বলেন, মায়ানমার সীমান্তেই চোরাকারবার আটকাতে হবে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য একটা বড় অংশের ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারবারিদের চিহ্নিত করে পদক্ষেপ করা জরুরি।