আলিপুরদুযার, ১৬ মার্চঃ লোকসভা ভোটের আগে ক্রমেই উত্তপ্ত হযে উঠছে আলিপুরদুয়ার তথা ডুয়ার্সের বনবস্তি এলাকার পরিবেশ। গোটা দেশের সঙ্গে এই রাজ্যেও বনবস্তির কয়েক লক্ষ বাসিন্দার মাথায় সুপ্রিমকোর্টের উচ্ছেদের খাঁড়া ঝুলছে। আগামী ১২ জুলাইয়ের মধ্যে বনবস্তির বাসিন্দাদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শেষ করবার যে নির্দেশ সুপ্রিমকোর্ট জারি করেছিল, তা আপাতত স্থগিত থাকলেও উচ্ছেদের আশঙ্কা এখনও কাটেনি। এহেন পরিস্থিতিতে লোকসভা ভোটকে কেন্দ্র করেই তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে বনবস্তির বাসিন্দাদের সংগঠনগুলি। এমনকি উচ্ছেদের বিষয়টিকে সামনে রেখে আলিপুরদুয়ার লোসকভা কেন্দ্রে প্রয়োজনে ভোট বয়কটেরও ডাক দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন বনবস্তির বাসিন্দাদের সংগঠনের নেতারা। আগামী ১৮ মার্চ আলিপুরদুয়ারে বনবস্তির বাসিন্দাদের মহামিছিলের পর লোকসভা ভোট নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে। অপরদিকে, লোকসভা ভোটের আগে বনবস্তির বাসিন্দাদের সহানুভতি আদায় করতে ইতিমধ্যেই মাঠে নেমে পড়েছে তণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি।

আলিপুরদুয়ার জেলায় বক্সাপাহাড় সহ সমতলে ৮০টির বেশি বনবস্তি রয়েছে। এই বনবস্তিগুলিতে প্রায় ৩২ হাজার মানুষ বসবাস করেন। আলিপুরদুয়ার জেলায় মূলত কালচিনি, মাদারিহাট, আলিপুরদুযার-২ এবং কুমারগ্রাম ব্লকে বনবস্তি রয়েছে। এরমধ্যে কালচিনি ব্লকের রাজাভাতখাওয়া গ্রাম পঞ্চায়েতেই প্রায় ১৪ হাজার বনবস্তিবাসী ভোটার রয়েছেন। সম্প্রতি সুপ্রিমকোর্ট বনবস্তির বাসিন্দাদের উচ্ছেদের যে নির্দেশিকা জারি করেছে তাতে দেশজুড়ে বনবস্তির বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জঙ্গলে বনবস্তির বাসিন্দাদের আইনগত অধিকারের দাবিতে এবং উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আগামী ১৮ মার্চ আলিপুরদুযার শহরে বনবস্তির বাসিন্দাদের সংগঠন উত্তরবঙ্গ বনজন শ্রমজীবী মঞ্চ মিছিলের ডাক দিয়েছে। এই মিছিলের সমর্থনে শুক্রবার দুপুরে কালচিনি ব্লকের রাজাভাতখাওয়ায় মিছিল করেন স্থানীয বনবস্তির বাসিন্দারা। মিছিলে গারোবস্তি, বামনিবস্তি, পাম্পুবস্তি, পানিঝোরাবস্তি ও নয়াবস্তির বাসিন্দারা শামিল হন।

উত্তরবঙ্গ বনজন শ্রমজীবী মঞ্চের আহ্বাযক লাল সিং ভুজেল বলেন, ২০০৬ সালে পার্লামেন্টে বনাধিকার আইন পাস হয়েছে। এরপর ২০০৯ সালে কিছু অবসরপ্রাপ্ত বনাধিকারিক, কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মিলে বনবস্তির বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে একটি মামলা দায়ের করে। দীর্ঘদিন ধরে এই মামলার শুনানি চলছে। ২০০৯ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার বনবস্তির বাসিন্দাদের পক্ষে মামলা লড়বার জন্য সুপ্রিমকোর্টে তাদের আইনজীবী নিয়োগ করত। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার এই মামলায় তাদের আইনজীবী পাঠানো বন্ধ করে দেয়। এর ফলে সম্প্রতি সুপ্রিমকোর্ট মামলাকারীদের বক্তব্য একতরফা শুনে এই রায় দিয়েছে। এখন গোটা দেশের বনবস্তির বাসিন্দারা উচ্ছেদের আশঙ্কায় ভুগছে। আমরা লোকসভা ভোটের আগে এই বিষয়ে আন্দোলনে নামলেও এই নিয়ে কোনো রাজনীতি চাই না। আমরা ভোটে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলকে সমর্থনও করব না। বনবস্তির বাসিন্দাদের উচ্ছেদের প্রতিবাদে আমরা লোকসভা ভোটে আদৌ ভোট দেব কিনা তা ১৮ মার্চের পর ঠিক করব।

এদিকে, উচ্ছেদের বিষযটি নিয়ে বনবস্তির বাসিন্দাদের মন টানতে ইতিমধ্যে মযদানে নেমে পড়েছে শাসকদল। শুক্রবার তণমূল জযন্তীর পুকুরি বনবস্তিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিযে বৈঠক করে। তণমূল নেতা অ্যালবার্ট সাংমা বলেন, বনবস্তির বাসিন্দাদের সংগঠনই বলছে কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিমকোর্টে আইনজীবী নিয়োগ না করায় একতরফা রায় হয়েছে। এই ঘটনায় কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার দোষী। আমাদের রাজ্যে ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার বনাধিকার ২০০৬ আইনকে মান্যতা দিয়ে বনবস্তির বাসিন্দাদের ফরেস্ট ভিলেজ থেকে রেভিনিউ ভিলেজে পরিণত করেছে। বনবস্তির বাসিন্দাদের জমির পাট্টা ও খতিয়ান দেওয়ার কাজও সম্পন্ন হয়েছে। আমরা বনবস্তির বাসিন্দাদের পাশে আছি।

অপরদিকে, বিজেপির জেলা সভাপতি গঙ্গাপ্রসাদ শর্মা বলেন, লোকসভা ভোটের আগে বিষয়টি স্পর্শকাতর বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ১১ লক্ষ বনবস্তিবাসীর উচ্ছেদের নির্দেশ স্থগিত রাখবার জন্য সুপ্রিমকোর্টের কাছে আবেদন জানিয়েছে। কেন্দ্রের আবেদনে সুপ্রিমকোর্ট সাড়াও দিয়েছে। গঙ্গাপ্রসাদ শর্মার পালটা অভিযোগ, ২০০৬ সালে বনবস্তির বাসিন্দাদের বনাধিকার আইন পাস হয়েছে। সেই আইন অনুযায়ী এই রাজ্যে বনবস্তিবাসীদের জন্য ঠিকমতো কাজ হলে আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হত না। বছরের পর বছর রাজ্য সরকারের বন দপ্তর এবং ভূমি ও ভূমিরাজস্ব দপ্তর এই নিয়ে উদাসীন ছিল। আলিপুরদুয়ারে বক্সা টাইগার রিজার্ভের অন্তর্গত বনবস্তির বাসিন্দাদের উচ্ছেদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বন দপ্তর চেষ্টা করছে। আমরা বনবস্তির বাসিন্দাদের পাশে আছি।