দেদার কাঠ চুরি উত্তমচন্দ্র ফরেস্টে, বনরক্ষা কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

369

মহম্মদ হাসিম, নকশালবাড়ি : বনভূমি রক্ষা করতে রাজ্য সরকার সামাজিক প্রকল্পে কাঠচোরদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে এনে তাঁদের হাতেই বনরক্ষার দাযিত্ব তুলে দিয়েছে। প্রতিটি বনাঞ্চলে গ্রামবাসীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে ফরেস্ট প্রোটেকশন কমিটি (এফপিসি)। কিন্তু নকশালবাড়ি ও খড়িবাড়ি ব্লককে নিয়ে গঠিত উত্তমচন্দ্র ছাট (ইউসিসি) ফরেস্ট-এর বনরক্ষা কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকাবাসীদের অভিযোগ, ২০০৮ সালে এই বনাঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য বনরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাত্ই ওই কমিটি ভেঙে ৬০ সদস্যকে নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করেছে বন দপ্তর। এই নতুন কমিটির কার্যকলাপের প্রতিবাদে সরব হয়েছেন এলাকাবাসীরা। স্থানীয় বাসিন্দা কিশোর বিশ্বকর্মা, সুনীল টিগ্গা, ধনরাজ রাই, রেণুকা রাই জানান, নতুন এই কমিটিতে বেশিরভাগ সদস্যই বহিরাগত, যাঁদের সঙ্গে এই বনভূমির কোনো সম্পর্কই নেই। কমিটির কয়েকজনের কোনো অস্তিত্ব নেই। এর ফলে দিনদুপুরে কাঠচোররা জঙ্গল থেকে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বনকর্মীরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।

১৯৯৪ সালে ২১৩ হেক্টর জমি নিয়ে উত্তমচন্দ্র ছাট ফরেস্ট গড়ে ওঠে। এই বনাঞ্চলের আশপাশে রয়েছে আটটি গ্রাম। হাতির জন্য এই গ্রামগুলিতে বিহার থেকে আসা কাঠ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। কারণ, হাতি গাছ ভাঙলেই সেই গাছগুলি স্থানীয় কয়েকজন যুবক ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেন। নকশালবাড়ি টুকরিয়া রেঞ্জ থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ইউসিসি ফরেস্টের পাশেই রামভোলাইজোতে বনরক্ষা কমিটির সদস্যদের নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন যুবক কাঠ ব্যবসার মিলিত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দা তথা প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য সিপিএমের কিশোর বিশ্বকর্মা জানান, নিয়ম অনুসারে প্রত্যেকটি গ্রাম থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে বনরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু নতুন কমিটিতে তা মানা হয়নি। যার দরুন প্রতিদিন এই জঙ্গল থেকে শাল, সেগুন, চিলোনির মতো মূল্যবান গাছ চুরি হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর রাজ্য সরকার বনরক্ষা কমিটির প্রত্যেক সদস্যকে বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা অনুদান দিয়ে থাকে। নতুন কমিটির কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সেই টাকা নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে চলেছেন। উলটে এই কমিটির সদস্যরাই জঙ্গল থেকে গাছ কেটে চোরাকারবারিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। বনরক্ষায় গ্রামবাসীদের নিয়ে সচেতনতা শিবির, সার্চলাইট, হাতির হাত থেকে ধানরক্ষায় বনকর্মীদের সহযোগিতার মতো কোনো কাজই কমিটি করছে না বলে অভিযোগ। এর ফলে প্রতি বছর রাজ্য সরকারের দেওযা লক্ষ লক্ষ টাকা জলে যাচ্ছে। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য তুফান মল্লিক জানান, নতুন এই বনরক্ষা কমিটি কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতেই রয়ে গিয়েছে। যার ফলে দিনে দিনে উত্তমচন্দ্র ছাট বনাঞ্চল বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে বন দপ্তরে অবস্থান বিক্ষোভের হুমকি দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে ইউসিসি ফরেস্টের বিট অফিসার গোবিন্দ ছেত্রী বলেন, এত বড়ো জঙ্গল দেখার জন্য আমাদের বিটে মাত্র পাঁচজন কর্মী রয়েছেন। বন্দুক, গাড়ির কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে এক্ষেত্রে আমাদের বনাঞ্চল রক্ষায় এফপিসির উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু তাদের কাছ থেকে আমরা কোনোরকম সহযোগিতা পাই না। শুধুমাত্র টাকা এলেই বনরক্ষা কমিটির সদস্যরা অফিসে এসে ভিড় করেন। তবে হাতির ভেঙে দেওযা গাছ আমরাই সরিয়ে ফেলি। তাঁর স্বীকারোক্তি, প্রতি বছর বনরক্ষা কমিটি পরিবর্তন হওযা দরকার। কিন্তু আমাদের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়।

- Advertisement -