সন্ধ্যা ও কাকভোরে কাঠ ও খড়ি পাচার

637

ধূপগুড়ি : বন দপ্তর, পুলিশের নজর এড়াতে গভীর রাত বা দিনেরবেলা বাদ দিয়ে কাকভোর ও গোধূলিতেই বনের কাঠ ও খড়ি পাচারের সময় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন পাচারকারী ও লাইনম্যানরা। একসময় বেলা পড়তেই ধূপগুড়ি শহর লাগোয়া বেশকিছু বন সংলগ্ন এলাকা থেকে সাইকেলে চাপিয়ে খড়ি নিয়ে আসার ছবি ছিল একেবারেই চেনা। কিন্তু বন দপ্তরের লাগাতার প্রচার এবং ধরপাকড়ে তা এখন অনেকটা কমেছে বলে দাবি বন আধিকারিকদের। যদিও এলাকাবাসীদের বক্তব্য, পাচার কমেনি। পাচারকারীরা শুধু সময বদলেছে।

স্থানীয সূত্রে জানা গিয়েছে, এই পাচারের প্রথম ধাপে বন থেকে কেটে আনা গাছ চিরে বা ফাটিযে বাটাম এবং খড়ি তৈরি করা হয়। এরপর তা সাইকেলে চাপিয়ে শহরের খড়ি বা কাঠের গোডাউনে পৌঁছে দেন ক্যারিযার ও লাইনম্যানরা। এক কুইন্ট্যাল খড়ির জন্য দাম মেলে ৫০০ টাকা। এর মধ্যে ১৫০ টাকা পান ক্যারিযার এবং বাকি ৩৫০ টাকা পান যিনি বন থেকে গাছ কেটে এনেছেন। অনেক ক্ষেত্রে মহিলারা খড়ি হিসেবে গাছ কেটে আনার পর তা ফাটিযে সাইকেলে চাপিযে শহরে খড়ির গোডাউনে পেঁছে দেওয়ার কাজ করেন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। সেক্ষেত্রে খড়ির দাম হিসেবে পুরো টাকা পরিবারের হাতে যায়। শহরের মিষ্টি, ছানা ও দই কারখানা সহ বেশ কিছু জায়গায় এখনও প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে শালখড়ি জোগান দেওয়া হয়। ধূপগুড়ি লাগোয়া সোনাখালি, নাথুযা ফরেস্ট থেকে সাইকেলে চাপিয়ে সোজা ফ্যাক্টরিতে নিযে যাওয়া হয় খড়ি। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে ছটার মধ্যে দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গোডাউনে খড়ি পৌঁছে যায়। খড়ি ছাড়া পাচার হয় বন থেকে চুরি করা কাঠের বাটাম ও তক্তা। সাইকেলে চাপিয়ে শহরে আনা হয় সেগুলিও। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত লোকেদের সূত্রে জানা গিয়েছে, এক সাইকেলে চার সিএফটি কাঠ আনা হয়। এজন্য ক্যারিয়ার বা লাইনম্যানকে কুড়ি কিলোমিটার পর্যন্ত সিএফটি প্রতি ২৫০ টাকা দেওযা হয। দূরত্ব বেশি হলে সিএফটি প্রতি মজুরি মেলে ৩০০ টাকা অবধি। এক ট্রিপে দশ সিএফটি কাঠ নিয়ে এলেই পাওয়া যায় ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা। খড়ি থেকে কাঠের বাটাম নিয়ে যাওয়া অনেক বেশি পরিশ্রমসাধ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন এ কাজে যুক্ত এক ব্যক্তি বলেন, আগে বয়স কম ছিল। ফলে বাটাম নিযে আসতাম। বন দপ্তর তাড়া করলে সাইকেল ফেলে পালাতে হত। এখন আর অত পরিশ্রম করতে পারি না তাই ভোরবেলা খড়ি নিয়ে আসি।

- Advertisement -

সোনাখালি, রেতি, মোরাঘাট, খুট্টিমারি, নাথুযা, ধূমপাড়া, হলদিবাড়ি, গধেযারকুঠি সহ নানা এলাকা থেকেই প্রতিদিন ভোর রাতে সাইকেল চোরাই কাঠ আনা হয়। দিনের আলো ফুটে লোক চলাচল বাড়ার আগেই তা ঢুকে যায় শহরের নির্দিষ্ট গন্তব্যে। এক্ষেত্রে ক্যারিযারদের আগলে বা পথে গার্ড দিযে নিয়ে আসে লাইনম্যানরা। বন দপ্তরের গাড়ি, পুলিশের মোবাইল ভ্যানের খবর রাখার পাশাপাশি লাইনম্যানদের কাজ হল, সেফ রুটের ক্লাব এবং মাতব্বরদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা। এক লাইনম্যান জানান, প্রতিদিন, এমনকি মাঝপথেও রুট বদলাতে হয়। সেজন্য ক্যারিযাররা হেডফোনে নির্দেশ পান।

তবে বন দপ্তরের মোরাঘাট ফরেস্ট রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার রাজকুমার পাল বলেন, ‘আমরা দুটো পথ বেছে নিয়েছি। একদিকে লাগাতার অভিযান চালাচ্ছি, অন্যদিকে মানুষকে চোরাই কাঠ ও খড়ি না কেনার জন্য সচেতন করে চলেছি। এই দ্বিমুখী পদক্ষেপের সুফলও মিলছে। প্রতিনিয়ত রুট ও কায়দা বদলাতে বাধ্য হচ্ছে পাচারকারীরা।’ তিনি বলেন, ‘পাচার রোধে শিক্ষিত মানুষদেরও দায়িত্ব আছে। যদি তাঁরা ফরেস্টের চোরাই কাঠ ও খড়ি কেনা বন্ধ করে দেন, তাহলে এই চোরাকারবার বন্ধ হতে বাধ্য।’

ছবি- সাইকেলে কাঠ পাচার।

তথ্য ও ছবি- সপ্তর্ষি সরকার