ওড়ার স্বপ্ন ছেড়ে শখের রান্নায় সফল প্রাক্তন বিমানকর্মী

জম্মু : স্বপ্ন সফল হওয়া আর জীবনযুদ্ধে সাফল্য পাওয়া সবসময় একরকম নাও হতে পারে। অনেকে যে লক্ষ্য নিয়ে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন, সময়ে সঙ্গে তা বদলে যায়। সেই বদল জীবনকে নতুন লক্ষ্যের মুখোমুখি করে তোলে। জম্মুর বাসিন্দা রাহুল মাগোত্রার গল্পটা এরকমই। ২৯ বছর বয়সি রাহুলের স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়া। সেই স্বপ্নের ডানায় ভর করে বিমানকর্মীর পেশায় যোগ দিয়েছিলেন। গো এয়ার, ইন্ডিগোয় কাজ করার পর যোগ দিয়েছিলেন এতিহাদ এয়ারওয়েজে। আবু ধাবিভিত্তিক বিমান সংস্থায় যোগ দেওয়ার কয়েকমাস পরই রাহুলের স্বপ্নের বিমান প্রায় গোত্তা খেয়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করে। করোনা সংক্রমণের জেরে একের পর এক দেশ আন্তর্জাতিক উড়ান বন্ধ করে দেয়। অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার মতো এতিহাদের উড়ানের সংখ্যা দিনকে দিন কমতে থাকে। পাল্লা দিয়ে কমে যায় ক্রু মেম্বারদের কাজ। বিমান সংস্থার তরফে রাহুলের আবু ধাবিতেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বটে। কিন্তু শহরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁদের বাড়ির বাইরে বেরোনো কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দিনের পর দিন ঘরে বসে থেকে বিরক্ত হয়ে যান উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখা যুবক। প্রথমসারির আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। তবে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়নি জম্মুর এই তরুণের। প্রবল ঝুঁকি নিয়ে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন।

ওড়ার স্বপ্ন দেখলেও ছেলেবেলার তাঁর শখ ছিল রান্না করা। চাইনিজ, কন্টিনেন্টাল, সব ধরনের খাবার রান্না করে বাড়ির লোককে তাক লাগিয়ে দিতেন শখের এই রাঁধুনি। বাড়ি ফিরে সেই শখকেই পেশা হিসাবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন রাহুল। খুলে ফেলেন নিজের হোম ডেলিভারি সংস্থা সেফ সিটি। বিনিয়োগ বলতে নিজের জমানো কিছু আর বাবার কাছে ধার নেওয়া টাকা। জম্মু শহরে হোম ডেলিভারি সংস্থা কিন্তু কম নেই। আর করোনা আবহে কতজনই বা বাইরে থেকে খাবার আনানোর ঝুঁকি নেন। গ্রাহকদের দ্বিধা কাটানোকে তাই প্রথমে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন রাহুল। বিমান সংস্থায় কাজের সুবাদে পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মানুবর্তিতা সম্পর্কে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা ছিলই। হোম ডেলিভারি শুরু করার সময় তাই দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। বাড়িতে রান্নার ব্যবস্থা করলেও এমন দুটি ঘরকে বেছে নেন, যেখানে বাইরের লোকের ঢোকার সম্ভাবনা নেই। একজন সহযোগী নিয়ে নিজেই রান্না করেন। বাজার থেকে শাকসবজি কেনা থেকে শুরু করে খাবার প্যাকেট করা, প্রতিটি পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা ও জীবণুমুক্ত করাকে গুরুত্ব দেন। রান্না থেকে খাবার সরবরাহ, সবক্ষেত্রে রাহুল সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন যথাসম্ভব কম হাতবদল এবং স্পর্শহীন অর্ডার ডেলিভারিতে।

- Advertisement -

তাঁর সেফ সিটিতে একমাত্র ফোনেই অর্ডার নেওয়া হয়। মৌখিকভাবে কোনও অর্ডার নেওয়া হয় না। প্রয়োজন অনুযায়ী গ্লাভস, মাস্ক ও স্যানিটাইজার ব্যবহার করা হয়। অর্ডার পাওয়ার পর রান্না হয়ে গেলে রাহুল বা তাঁর সঙ্গীই মূলত গ্রাহকের বাড়ি পৌঁছে দেন। সেখানেও দূরত্ববিধি মেনে চলা হয়। বাড়ির দরজায় খাবার রেখে বেল বাজিয়ে তাঁরা সরে যান। গ্রাহক দরজা খুলে খাবার সংগ্রহ করেন। দাম মেটানো হয় অনলাইনে। দোকান থেকে কেনা খাবারের বদলে অনেকেই তাই স্বাদ বদল করতে রাহুলকে অর্ডার দিচ্ছেন। এভাবেই গত কয়েকমাসে বেশ কিছু নিয়মিত গ্রাহক তৈরি হয়ে গিয়েছে। তাঁদেরই একজন সতপাল সিং বলেন, নিরাপদ খাবারের খোঁজ করছিলাম। দেখলাম, এ ব্যাপারে রাহুলই সেরা। তিনি খাবার তৈরি থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত যেভাবে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলেন, তা অনেক রেস্তোরাঁতেও দেখা যায় না। এই গ্রাহক সন্তুষ্টিই এখন রাহুলের ইউএসপি। তিনি বলেন, ব্যবসায় লাভের পরিমাণ এখনও খুব সামান্য। ধীরে ধীরে গ্রাহক সংখ্যা বাড়ছে। তবে একটা কথা বলতে পারি, নতুন কাজে আনন্দ পাচ্ছি। স্বপ্ন ছেড়ে এখন শখের পেশাতেই সাফল্যের দিশারি হতে চাইছেন প্রাক্তন বিমানকর্মী।