রংমিস্ত্রির কাজ করছেন বাঁহাতি বোলার মিঠুন

324

সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট: পান সিং তোমারকে মনে আছে! জাতীয়স্তরের এই অ্যাথলিট নিজের জমি  বাঁচাতে নিজের মেডেল পুলিশকে দেখিয়ে পাত্তা পাননি। শেষ পর্যন্ত নিজের অধিকার বুঝে নিতে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে চম্বলের বাগি (ডাকাত) হয়ে গিয়েছিলেন। সেই ধারা আজও চলছে রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে।

যাঁরা একসময় মাঠ কাঁপিয়ে খেলতেন, যাঁদের কথা ভেবে বিপক্ষের ঘুম উড়ে যেত, তেমন অনেকেই খেলা ছেড়ে অন্তরালে চলে যেতে বাধ্য হন জীবনজীবিকার স্বার্থে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ বালুরঘাট শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দিশারিপাড়া এলাকার সনজিৎ মণ্ডল। খেলার মাঠে যাঁর নাম ছিল মিঠুন। বাঁ হাতি ফাস্ট বোলার একসময় জেলাস্তরে ব্যাটসম্যানদের ত্রাস ছিলেন। ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ এই খেলোয়াড় দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর চুটিয়ে জেলাস্তরেই খেলে গিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালের পর তিনি পুরোপুরিভাবে ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিয়েছেন। সংসার ও পেটের কাছে মাথা নত করে ভালোবাসার ক্রিকেটকে বাদ দিয়ে রং মিস্ত্রির কাজ করে জীবন চালাচ্ছেন ৪৮ বছরের মিঠুন। তবে সেই কাজে খেলার মতো ততটা সফল নন তিনি। সারা মাসে হাতেগোনা কয়েকটি কাজ মেলে। ফলে সংসার চালাতে তার সমস্যা রয়েছে। ভুগছেন  প্রবল আর্থিক অনটনে।

- Advertisement -

একসময় বাঁ হাতি এই বোলার মিঠুনকে পেতে বালুরঘাটের ক্লাবগুলিতে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। দীর্ঘ ক্রিকেট জীবনে মিঠুন তাই কখনও টাউন ক্লাবের হয়ে কখনও ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন ক্লাব এর হয়ে তো কখনও যাত্রিক, ত্রিধারা ইত্যাদি নানা ক্লাবের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। জেলা একাদশের হয়ে বিভিন্ন এলাকায় খেলতে গিয়েছেন। তবে টেনিস বল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের অত্যন্ত সফল প্লেয়ার ছিলেন মিঠুন। জেলার যেখানেই টেনিস বল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হত, সেখানেই ডাক পড়ত মিঠুনের। যে-কোনো দলের হয়ে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বোলিং করতেন মিঠুন। এত প্রতিভাবান একজন খেলোয়াড়ের যেমন রাজ্যস্তরে খেলতে যাওয়া হয়নি, তেমনি সরকারি কোনও সুযোগসুবিধাও পাননি।

পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে বছর কয়েক আগে আর্থিক অনটনের কারণে স্ত্রীও ছেড়ে গিয়েছে। দুই ছেলেকে বড় করতে গিয়ে আর্থিক অনটনে হিমসিম খাচ্ছেন মিঠুন। বড় ছেলে কুণাল বছর কয়েক আগেই পড়াশোনা ছেড়ে রং মিস্ত্রির কাজ শুরু করেছে। তবে ছোট ছেলে কুশল পড়াশোনা করছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি পড়াশোনা ছেড়ে তিনিও একটি চানাচুরের ফ্যাক্টরিতে কাজ করছেন।

মিঠুন মণ্ডলের বক্তব্য, নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছি, খেলে কিছু হয় না। আগে তো তাও নানা টুর্নামেন্ট হত, খেলার অবস্থা ভালো ছিল। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই। খেলার মান অত্যন্ত নেমে গিয়েছে। এছাড়াও খেলোয়াড়দেরও কোনও সম্মান নেই। পেট চালাতে  খেটেই খেতে হবে, তাই ছেলেদের খেলার মাঠে যেতে দিইনি।

বিভিন্ন সময়ে মিঠুন মণ্ডল ম্যান অফ দ্য ম্যাচ, ম্যান অব দ্য সিরিজ সহ বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। এমন প্রায় ২৫০টি ট্রফি রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। সেগুলি একটি বস্তাবন্দি করে খাটের তলায় জমিয়ে রেখেছেন। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভাবের তাড়নায় এক সময় ওই ট্রফিগুলিকে বেচে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। তবে যা পরিস্থিতি, ট্রফিগুলি কতদিন আর আগলে রাখতে পারব জানি না। যখন খেলতাম তখন সকলেই প্রতিশ্রুতি দিতেন,  কিন্তু পরে কেউই একটা কাজও  জুটিয়ে দেয়নি,  কেউ পাত্তাই দেয় না। তাই মন না চাইলেও রং মিস্ত্রির কাজ করতে হয়।

প্রাক্তন খেলোয়াড় তথা ফোরামের সভাপতি বিদ্যুৎ দাম বলেন, সত্যি আমাদের মতো প্রান্তিক জেলাগুলিতে খেলোয়াড়দের নিয়ে ভাবনাচিন্তা খুবই কম হয়। অন্য অনেক জেলাতে স্পোর্টস  কোটায় খেলোয়াড়রা চাকরিতে নানা সুযোগ পান। কিন্তু আমাদের জেলায় কোনওদিনই সেসব হয় না। মিঠুন মণ্ডল সত্যিই খুবই কষ্টে রয়েছেন। আমরা ফোরামের তরফ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। জেলার এমন প্রাক্তন খেলোয়াড়দের সহায়তায় প্রশাসন এগিয়ে এলে ভালো হয়। সিএবির অ্যাপেক্স কমিটির সদস্য গৌতম গোস্বামী বলেন, খেলোয়াড়দের জন্য যে সুযোগসুবিধা আছে তা সবই হয় কলকাতার আশেপাশের জন্য। মফস্সল শহরের খেলোয়াড়রা কোনও সুযোগসুবিধা পান না। তবে সবাই যাতে সমান সুযোগ পান, সেই ব্যাপারে আমাদের লড়াই চালু আছে।