ডাক-নিয়োগে জালিয়াতি, জাল মার্কশিট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা লুট

224

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : উত্তরবঙ্গজুড়ে কয়েক কোটি টাকার প্রতারণা। উত্তরপ্রদেশ এবং বিহার বোর্ডের ভুয়ো সার্টিফিকেট তৈরি করে উত্তরের জেলায় জেলায় ডাকবিভাগে গ্রামীণ ডাক সেবক (জিডিএস) পদে নিয়োগ করা হয়েছে শতাধিক কর্মী। উত্তরবঙ্গের চা বলয় এবং আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে সক্রিয় হয়েছে ওই চক্র। চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডাকবিভাগের বেশ কয়েকজন পদস্থ আধিকারিক।

ডাক-নিয়োগে জালিয়াতি, জাল মার্কশিট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা লুট| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaভুয়ো সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরির তদন্ত শুরু করেছে পোস্টাল ভিজিলেন্স বিভাগের আধিকারিকরা। সাইকেল-১ এবং ২-এ চাকরি পাওয়া গ্রামীণ ডাক সেবকদের প্রত্যেকের নথি পুনরায় যাচাই করে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেইমতো কাজও শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট বোর্ডের ওয়েবসাইটে গিয়ে মার্কশিট, সার্টিফিকেট মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ওয়েবসাইটের তথ্যের সঙ্গে অসংগতি থাকলেই পুলিশে এফআইআর করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন ডিভিশনের আধিকারিকদের। পোস্টাল ভিজিলেন্স বিভাগের উত্তরবঙ্গের দায়িত্বে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর অফ পোস্ট অফিসেস সব্যসাচী বর্মন বলেন, অনেক অভিযোগ আছে। সবটাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত দপ্তরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। সেই বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।

- Advertisement -

ডাকবিভাগের সাইকেল-১ এবং সাইকেল-২এ জিডিএস পদে নিয়োগ নিয়ে একাধিক অভিযোগের কথা জানতে পারি আমরা। তারপরই শুরু হয় বিশেষ তদন্ত। তাতেই উঠে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, রাজ্যের অন্য প্রান্ত ছাড়াও ত্রিপুরা এবং গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে সক্রিয় রয়েছে প্রতারণাচক্রটি। জিডিএস পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনও লিখিত পরীক্ষা বা ইন্টারভিউ হয় না। আবেদনকারীদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ নম্বরের ভিত্তিতে মেধাতালিকা তৈরি হয়। সেই তালিকা মেনে সরাসরি নিয়োগ করা হয়। দেশের যে কোনও প্রান্তের প্রার্থীরাই সংশ্লিষ্ট পদের জন্য আবেদন করতে পারেন। এক্ষেত্রে কোনও রাজ্য বা শিক্ষা বোর্ডের জন্য পৃথক সুবিধা দেওয়া হয় না। সোজা কথায়, যাঁর নম্বর বেশি তিনিই চাকরি পাবেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতারণাচক্রটি জাল সার্টিফিকেট তৈরি করছে। তাতে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো নম্বর বসানো হচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ে কখনও ৯৮, কখনও ৯৭ নম্বর বসিয়ে দেওয়া হয়।

উত্তরপ্রদেশ মাধ্যমিক শিক্ষা পরিষদের আদলে হুবহু সার্টিফিকেট, মার্কশিট, অ্যাডমিট কার্ড তৈরি করা হচ্ছে। সার্টিফিকেট তৈরি হচ্ছে বিহার বোর্ডের আদলেও। সার্টিফিকেট, মার্কশিটগুলি মালদা এবং আলিপুরদুয়ারের দুটি গোপন ডেরায় তৈরি হচ্ছে বলেই জানা গিয়েছে। যেহেতু নম্বর অনেকটাই বেশি করে বসানো থাকে, তাই স্বাভাবিকভাবে প্রতারণচক্রের প্রর্থীরা চাকরিও পেয়ে যাচ্ছে। চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে ভুয়ো সার্টিফিকেটের ভুয়ো ভেরিফিকেশন রিপোর্টও তারা তৈরি করে ফেলছে। এভাবে ইতিমধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে উত্তরের বিভিন্ন জেলায় চাকরি পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। জাল সার্টিফিকেটে সব থেকে বেশি চাকরি হয়েছে ডাকবিভাগের কোচবিহার ডিভিশনের আলিপুরদুয়ার জেলায়। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, মালদা- এই চার জেলাতে ভুয়ো সার্টিফিকেট ছেয়ে গিয়েছে। ৫ থেকে ৬ লক্ষ টাকায় চাকরি পাইয়ে দেওয়ার চুক্তি হচ্ছে।

একাধিক কেস স্টাডিতে দেখা গিয়েছে, তিন দফায় টাকা তুলছে প্রতারকরা। আগাম হিসাবে নেওয়া হচ্ছে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। বাকি টাকার বেশিরভাগটাই নেওয়া হচ্ছে সার্টিফিকেট তৈরির পর। অবশিষ্ট টাকা চাকরি পাইয়ে দেওয়ার পর নেওয়া হচ্ছে। তদন্ত শুরুর পর শাস্তি পাওয়ার ভয়ে ইতিমধ্যে শুধুমাত্র কোচবিহার ডিভিশনে জাল সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি পাওয়া ১৫ জনেরও বেশি গ্রামীণ ডাক সেবক চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। যদিও বাকিরা এখনও বহালতবিয়তেই চাকরি করছেন।

বছরখানেক আগে গ্রামীণ ডাক সেবকের চাকরি পেয়েছিলেন আলিপুরদুয়ারের মাঝেরডাবরির দক্ষিণ শিবকাটা এলাকার পিন্টু হাজারি। দিনকয়েক আগে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। প্রতারণাচক্রের খপ্পরে পড়ে জাল সার্টিফিকেট কেনার কথা স্বীকার করেছেন পিন্টু। তিনি জানিয়েছেন, চাকরির লোভে জমি বিক্রি করে এখন পর্যন্ত ৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন প্রতারণাচক্রের লোকেদের হাতে। পিন্টুকে উত্তরপ্রদেশের মাধ্যমিক পাশ সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, যাদের টাকা দিয়েছিলেন তারা কয়েকদিন আগে বাড়িতে এসে পদত্যাগপত্র জমা দিতে বলে। পিন্টুর কথায়, আমরা একসঙ্গে প্রায় ৪০ জন টাকা দিয়েছিলাম। সবারই উত্তরপ্রদেশ বোর্ডের সার্টিফিকেট। আমাদের কয়েকজন পদত্যাগ করেছে। তবে, অনেকে এখনও আলিপুরদুয়ার জেলার বিভিন্ন পোস্ট অফিসে কাজ করছে। তিনি দাবি করেছেন, কোচবিহার ডিভিশন অফিসের এক পোস্টাল অ্যাসিস্ট্যান্টের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল। যারা টাকা নিয়েছিল তাদের অনেকেই ডাকবিভাগের কর্মী। সলসলাবাড়ির ডাকবিভাগের এক কর্মীও ওই চক্রে জড়িত। ওই কর্মীই জোর করে পিন্টুকে পদত্যাগ করিয়েছে। বিষয়টি পুলিশকে জানাননি কেন? পিন্টুর উত্তর, থানায় গেলে টাকা ফেরত দেবে না বলেছে। তাই এখনও অভিযোগ জানাইনি।

সূত্রের খবর, প্রতারণাচক্রের সঙ্গে জড়িত ডাকবিভাগের পদস্থ আধিকারিক এবং কর্মীরা চাকরি পাওয়া জাল সার্টিফিকেটধারীদের পদত্যাগ করানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ভুয়ো সার্টিফিকেট দিয়ে যাদের চাকরি পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে বলছে অভিযুক্তরা। অনেককে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আবার চাকরি না ছাড়লে কাউকে কাউকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।