স্বীকৃতি না পেলেও শিক্ষার রত্ন তাজমিরা

104

রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : তাজমিরা আজ মহিষবাথানির শিক্ষার আলোকবর্তিকা। ওই মেয়ে খাঁটি শিক্ষারত্ন। এহেন মেয়েকে দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন আসমাউল। তিনি দাঁড়িয়েছেন তাজমিরার পাশে। দুহাতে আগলে রেখেছেন এক প্রদীপ শিখাকে। তামাম পুরাতন মালদা এখন কুর্নিশ জানাচ্ছে তাজমিরা-আসমাউলের এই উদ্যোগকে। তাঁরা দুজনই মহিষবাথানি জুনিয়ার হাইস্কুলের বিনা বেতনের শিক্ষক। এলাকার পড়ুয়া ও অভিভাবকদের চোখের মণি।

২০১০ সালে প্রাইমারি স্কুল চত্বর ঘেঁষে তৈরি হয় মহিষবাথানি জুনিয়ার হাইস্কুল। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পঠনপাঠনের ব্যবস্থা হয় সেখানে। এলাকায় অন্য কোনো স্কুল না থাকায় এই স্কুলে ক্রমে পড়ুয়াদের চাপ বাড়তে থাকে। স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় সমস্যায় পড়তে হয় স্কুল কর্তৃপক্ষকে। চারটি ক্লাসের জন্য শিক্ষক ছিলেন মাত্র তিনজন। গ্রামের জুনিয়ার হাইস্কুলের এমন দুর্দশা দেখে চুপ থাকতে পারেননি ওই গ্রামেরই বাসিন্দা তাজমিরা বেগম। ইতিহাসের ওই ছাত্রী ২০১০ সালে এমএ পাস করার পর ২০১২ সালে ওই জুনিয়ার হাইস্কুলে স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে সংসার সামলেও বিনা পারিশ্রমিকে স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর কাজ শুরু করেন।

তাজমিরার স্বামী ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজ করেন। তিনি ওই স্কুলে স্বেচ্ছায় পাঠদান শুরু করার ফলে সমস্যা অনেকটাই কমে। বছর পাঁচেক পর তাজমিরার দেখানো পথেই জুনিয়ার হাইস্কুলে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে এগিয়ে আসেন গ্রামের অপর যুবক মহম্মদ আসমাউল হক। তিনিও ইতিহাসে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে ওই দুই যুবক-যুবতি মহিষবাথানি জুনিয়ার হাইস্কুলে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। সাড়ে দশটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত রুটিন মেনেই তাঁরা ক্লাস নেন। এমএ ও বিএড পাস করার পর সরকারি চাকরির বিভিন্ন পরীক্ষা দিচ্ছেন দুজনে। তবে এখন তাতে সাফল্য আসেনি। আসমাউল হক বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেওয়ায় নিয়ম করেই আমরা ক্লাস নিচ্ছি। এর ফলে পড়ুয়াদের অনেকটাই সুবিধে হচ্ছে। আর্থিকভাবে লাভবান না হলেও মানসিকভাবে শান্তি পাই।

কিন্তু ঘরে বসে না থেকে কচিকাঁচাদের পাঠদানের মাধ্যমেই নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন তাঁরা। বালুয়াটোলা, নতুনটোলা, পুরাতনটোলা, গুজরঘাটটোলা সমেত এলাকার অন্য গ্রামের পড়ুয়াদের দুর্দশার কথা মাথায় রেখেই স্বেচ্ছাশ্রমে ব্রতী হয়েছেন ওই দুজন। তাজমিরা বলেন, আমি এই গ্রামেরই মেয়ে। খুব কষ্ট করে আমাকে পড়াশোনা করতে হয়েছে। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর মহানন্দা নদী পেরিয়ে হেঁটে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে হাইস্কুলে পড়তে যেতাম। শুধুমাত্র জেদে ভর করে এমএ ও বিএড পাস করি। একটু থেমে তিনি বলেন, এতদিন পেরিয়ে গেলেও গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার তেমন একটা উন্নতি হয়নি। জুনিয়ার হাইস্কুলে শিক্ষকের ঘাটতি থাকায় ঠিকমতো পড়াশোনা হচ্ছিল না। টাকাপয়সা না পেলেও ছোটো ছোটো পড়ুয়ার হাসি মুখগুলোর দিকে চেয়ে ভালো লাগে। ওদের যেন আমার মতো কষ্ট করতে না হয়।

গ্রামেরই দুই উদ্যমী যুবক-যুবতি এইভাবে স্কুলের সংকটে পাশে দাঁড়ানোয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ওই স্কুলের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক গৌতম মণ্ডল। তিনি বলেন, মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে চারটি ক্লাসে একসঙ্গে পঠনপাঠন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ওই দুই যুবক-যুবতি স্বেচ্ছাশ্রম না দিলে আমরা সমস্যায় পড়তাম। এমন নিঃস্বার্থ উদ্যমকে অভিভাবকরাও স্বাগত জানিয়েছেন। অভিভাবক রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের গ্রামের ওই দুই যুবক-যুবতি যেভাবে পড়ুয়াদের কথা মাথায় রেখে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন, তা আমাদের কাছে গর্বের। স্বার্থ ত্যাগ করে তাজমিরা ও আসমাউলের এই মানবিক মুখ সত্যিই মহিষবাথানি গ্রাম পঞ্চায়েতের সকলের কাছেই একটা দৃষ্টান্ত।